বিষয় চলচ্চিত্র
রূপালি পর্দার চিরসবুজ ফরাসি আইকন ক্যাথেরিন দ্যুনোভের

‘বেল দ্যু জুর’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে ক্যাথরিন দ্যুনোভ
আজ ফরাসি জীবন্ত আইকনিক অভিনেত্রী ক্যাথেরিন দ্যুনোভের ৮৩তম জন্মদিন। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্রে তার অভিনয়শৈলী নিয়ে লিখেছেন রুদ্র আরিফ
ক্যাথরিন দ্যুনোভের জন্ম ২২ অক্টোবর ১৯৪৩; প্যারিসে। ১৯৫৭ সালে স্বদেশি নির্মাতা আঁদ্রে য়ুনবেলের কমেডি-ড্রামা ‘দ্য টোয়াইলাইট গার্লস’-এ স্কুলশিক্ষার্থীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তার। ৭০ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি ১৩০টির বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৬৪ সালে ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের ‘লেফট ব্যাংক’ গ্রুপের চলচ্চিত্রকার জ্যাক দ্যুমির ‘দি আমব্রেলাস অব শেরবুর’-এ জেনভিয়েভ চরিত্র তাকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নিজের প্রথম ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হওয়া এক তরুণীর চরিত্র এটি। দ্যুনোভ তার অভিনয় দক্ষতায় চরিত্রটিতে পুতুলের মতো সুকোমল ও ভঙ্গুর ভাবনার সঙ্গে বাস্তবসম্মত এবং পৃথিবীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সব মেনে নেওয়ার মধ্যকার চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এই চরিত্রে তার স্বাভাবিক, সাবলীল মাধুর্য এবং শান্ত বিষণ্ণতার প্রশংসা করেছেন দ্যুমি। নির্মাতা আরও বলেছেন, এই আনকোরা ও অখ্যাত অভিনেত্রীর শীতল ও সূক্ষ্ম সৌন্দর্য এবং আবেগঘন কোমলতা চলচ্চিত্রটির অকৃত্রিম ও গীতিময় মন ভাঙার বেদনাকে দৃঢ় ভিত্তি এনে দিয়েছে।
দ্যুনোভের এই অভিনয় সহসাই তাকে মাস্টার ফিল্মমেকারদের কাছে কাঙ্ক্ষিত অভিনেত্রীতে পরিণত করে। পরের বছরই পোলিশ-ফ্রেঞ্চ নির্মাতা রোমান পোলান্সকির ব্রিটিশ সাইকোলজিক্যাল হরর থ্রিলার ‘রিপালশন’-এ তিনি হাজির হন ক্যারল লেডু চরিত্রে। ক্যারল একজন অন্তর্মুখী ম্যানিকিউরিস্ট। ধীরে ধীরে মানসিক বিপর্যয় এবং অ্যান্ড্রোফোবিয়া বা পুরুষভীতির দিকে ধাবিত হয় সে। চরিত্রটিতে দ্যুনোভ এক হিমশীতল ও নিশ্চল নীরবতার মাধ্যমে অন্তস্তলের ভয়কে দৃশ্যমান করে তুলেছেন। পোলান্সকি বলেছেন, ত্রমাগত উন্মাদনার দিকে ভয়ংকরভাবে ধাবিত হওয়া এক তরুণীর চরিত্রে তিনি অভিনেত্রীর মধ্যে ‘সামান্য খুঁতযুক্ত দেবদূত’-এর বৈশিষ্ট্য চেয়েছিলেন; আর তাতে দ্যুনোভের শিউরে ওঠা, ন্যূনতম নিস্পৃহতা এবং ভঙ্গুর সৌন্দর্য এই নির্মাতাকে সন্তুষ্ট করেছে।
আবেগপ্রবণ মেলোড্রামা এড়িয়ে বরং শান্ত, সতর্ক ও সংযত ভাব বজায় রাখতে তিনি ভালোবাসেন
চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে ক্যাথেরিন দ্যুনোভ রীতিমতো ‘পোস্টারগার্ল’ হয়ে আছেন স্প্যানিশ-মেক্সিকান কিংবদন্তি এবং সর্বকালের অন্যতম প্রভাববিস্তারী নির্মাতা লুইস বুনুয়েলের ‘বেল দ্যু জুর’-এর কারণে। ১৯৬৭ সালের এই স্যুরিয়ালিস্ট ইরোটিক সাইকোলজিক্যাল ড্রামায় সেভরিন সেরিজি ওরফে বেল দ্যু জুর বা ‘দিবাকালের রূপসী’র ভূমিকায় দেখা গেছে তাকে। শীতল স্বভাবের এই বুর্জোয়া গৃহবধূ একঘেয়ে জীবনের গ্লানি থেকে নিস্তার পেতে গোপনে একটি দিনের বেলার পতিতালয়ে কাজ করে। এতে দ্যুনোভের জমাটবদ্ধ ও নিরাবেগ শারীরিক অভিব্যক্তি তার অবদমিত বাস্তবতা ও মুখোশাবৃত আত্মনিপীড়নমূলক কল্পনার মধ্যকার পরাবাস্তব ও কামোদ্দীপক উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তুেলছে। চরিত্রটিতে তার অভিনয় সম্পর্কে বুনুয়েল করেছিলেন বিখ্যাত উক্তি— ‘ভীষণ সুন্দর, সংযত ও আজব!’
স্বদেশি এবং নিউ ওয়েভের আরেক নির্মাতা ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর পিরিয়ড ড্রামা ফিল্ম ‘দ্য লাস্ট মেট্রো’তেও দেখা গেছে দ্যুনোভের অভিনয় দ্যুতি। ১৯৮০ সালের এই চলচ্চিত্রে তিনি মারিয়ঁ স্তেনার, যিনি একজন থিয়েটার ম্যানেজার। বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি-অধিকৃত প্যারিসে একটি নাটক এবং নিজের লুকিয়ে থাকা ইহুদি স্বামীকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামরত সে। চরিত্রটিতে ইস্পাতকঠিন বাস্তববাদ, নীরব দুঃখবোধ আর রোমান্টিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন দ্যুনোভ। এই অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে ত্রুফো বলেছিলেন, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সহজ-সরল মেয়ের চরিত্রগুলোতে অভ্যস্ত হলেও এখানে এই অভিনেত্রী সেখান থেকে সরে এসেছেন। স্বামীকে বাঁচানোর জন্য এমন ‘বিদ্বেষপূর্ণ, শীতল ও কঠোর’ চরিত্রে তার রূপান্তরটি এই নির্মাতার মতে ছিল সমীহ জাগানোর মতো।
অভিনয়ে একধরনের শীতল ও রহস্যময় উদাসীনতা, ভাস্কর্যতুল্য আভিজাত্য এবং ব্যঙ্গাত্মক স্পষ্টতার বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছেন ক্যাথেরিন দ্যুনোভ। অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ মেলোড্রামা এড়িয়ে বরং শান্ত, সতর্ক ও সংযত ভাব বজায় রাখতে তিনি ভালোবাসেন, যা তার মুখের অভিব্যক্তিতে গভীর অর্থ খুঁজে নিতে দর্শককে বাধ্য করে। তাকে প্রায়ই এমনসব নারীর চরিত্রে দেখা গেছে, যারা যাপন করে দ্বৈত জীবন; যেখানে পবিত্রতা ও অবাধ্যতা কিংবা পারিবারিক শৃঙ্খলা ও গোপন বিশৃঙ্খলার মধ্যে থাকে ভারসাম্য।



