লাইমলাইটের বাইরে

(বাঁ থেকে) একমাত্র ছেলের সঙ্গে সাবিনা ইয়াসমীন, স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে প্রয়াত নায়ক ফারুক, তিন ছেলেমেয়ের সঙ্গে আলমগীর, ছেলেমেয়ের সঙ্গে জাহিদ হাসান ও সাদিয়া ইসলাম মৌ, প্রয়াত হুমায়ুন ফরীদির একমাত্র কন্যা শারারাত ইসলাম দেবযানী
তারকা পরিবারে জন্মে অনেকে বাবা-মায়ের পথ অনুসরণ করেছেন। আবার অনেক তারকার সন্তান ভিন্ন পেশায় গিয়ে থেকেছেন আলোচনার বাইরে। তাদের গল্প বলছেন মীর রাকিব হাসান
নায়ক আলমগীরের তিন সন্তান আঁখি আলমগীর, মেহরুবা আহমেদ তুলতুল ও তাসভীর আহমেদ আলমগীর। আঁখি আলমগীর পরিচিত নাম। তুলতুল একসময় চাকরি করলেও এখন করেন না, বর্তমানে গৃহিনী। ছেলে তাসভীর পড়াশোনা শেষ করে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করছেন।
অভিনয়ে না এলেও প্রয়াত হুমায়ুন ফরীদির একমাত্র সন্তান শারারাত ইসলাম দেবযানী অভিনেতা ফরীদিকে নিয়ে স্মৃতিকথা সংকলনে আগ্রহী। দীর্ঘদিন ব্র্যাক, সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন; বর্তমানে ইউএন উইম্যানে কর্মরত।
সাবিনা ইয়াসমীনের দুই সন্তান ইয়াসমীন ফাইরুজ বাঁধন ও রাফি হোসেন শ্রাবণও মায়ের পথ অনুসরণ করেননি। বাঁধন ব্যাংকার; বর্তমানে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট। শ্রাবণ লন্ডনে হল্যান্ড অ্যান্ড ব্যারেটে কর্মরত।
শহীদুজ্জামান সেলিম ও রোজী সিদ্দিকীর দুই মেয়ে। বড় মেয়ে সেঁজুতি খান, মঞ্চনাটকে আগ্রহ থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর করে বর্তমানে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। ছোট মেয়ে সানজানা খান, ডাকনাম শ্রীমা, অস্ট্রেলিয়ায় অনার্স শেষ করে সেখানেই একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। দেশে থাকাকালে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবেও কাজ করেছেন।
অভিনেতা জাহিদ হাসান ও মডেল-অভিনেত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌয়ের দুই সন্তান জোহায়রা জাহিদ পুষ্পিতা ও জারিফ জাহিদ সাইম। পুষ্পিতা ছোটবেলায় নাচ ও অভিনয় করেছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পুরস্কারও পেয়েছেন। তার নামে বাবার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও ‘পুষ্পিতা প্রোডাকশন লিমিটেড’ রয়েছে। তবে বড় হয়ে পড়াশোনাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন, পড়ছেন কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছেলে জারিফেরও অভিনয়ে আগ্রহ নেই।
অভিনেতা ডা. এজাজুল ইসলামের চার সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে তাসফিয়া এজাজ, ছোট মেয়ে তাসনুভা এজাজ এবং বড় ছেলে শাহ মোহাম্মদ আবদুর রাফে— তিনজনই চিকিৎসক। ছোট ছেলে শাহ মোহাম্মদ আবু বাকার সিদ্দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে বর্তমানে হাঙ্গেরির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন।
অ্যাকশন হিরো রুবেলের একমাত্র ছেলে নিলয় পারভেজ লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে বর্তমানে চাকরি করছেন যুক্তরাজ্যের একটি ব্যাংকে। মরক্কোর জাইনাব আইতোখাইকে বিয়ে করেছেন তিনি। গত বছর দাদা হয়েছেন রুবেল।
বিদেশে বেড়ে ওঠা
মিশা সওদাগরের দুই ছেলে হাসান মোহাম্মদ ওয়ালিদ ও ওয়াইশ কার্নি হাসান যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। বড় ছেলে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা শেষ করেছেন। ছোট ছেলে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন।
সোহেল চৌধুরী ও দিতির দুই সন্তান শাফায়েত চৌধুরী ও লামিয়া চৌধুরী। শাফায়েত কানাডার রিয়ারসন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বিপণন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। গত বছর সেখানেই বিয়ে করেছেন। লামিয়া লন্ডন ফিল্ম স্কুলে ফিল্ম প্রোডাকশনে ডিপ্লোমা করেন। দেশে ফিরে নির্মাণে মন দিয়েছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর তার ইচ্ছায় ‘দুই পুতুল’ নাটক নির্মাণ করেন। ‘মেয়েদের গল্প’ নামে তিন মা ও তিন মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে অনেকদিন হলো সেই সিনেমা নির্মাণ শুরু হয়নি।
বাবা-মায়ের চাওয়া-পাওয়া
আঁখি চিকিৎসক হোক— এটাই চেয়েছিলেন নায়ক আলমগীর; কিন্তু আঁখি শেষ পর্যন্ত পেশাদার সংগীতশিল্পী হয়েছেন। আলমগীর জানালেন, আঁখি গান করবে— এটা স্বাভাবিক। কিন্তু পেশাদার শিল্পী হবে, সেটা তার মাথায় ছিল না। পরে মেয়ে নিজের যোগ্যতায় পেশাদার শিল্পী হয়ে উঠলে তিনি সেটি মেনে নিয়েছেন। ছোট মেয়ে তুলতুলকেও আইনজীবী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। ছেলে তাসভীর পড়াশোনা শেষ করে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করছেন।
প্রয়াত অভিনেতা ফারুকের সন্তান তুলসী ও রওশন হোসেন পাঠানের ক্ষেত্রেও বাবার দর্শন ছিল স্বাধীনতা। তুলসী বললেন, ‘নায়ক ফারুকের খ্যাতি, ব্যবসা সবকিছু থেকে দূরে রেখে পড়াশোনাটা করতে বলেছেন। পড়াশোনা, পেশা সবকিছুতে তিনি আমাদের নিজের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিতেন। আমাদের কখনো চলচ্চিত্রে যুক্ত করতে চাননি বাবা। বলতেন, যা খুশি করো। আমরা খুবই সৌভাগ্যবান যে, আমাদের এমন একজন বাবা ছিলেন।’
তানি লায়লাও ছোটবেলা থেকে গান শিখেছেন। তবে তানি পেশাদার সংগীতশিল্পী না হওয়ায় রুনা লায়লার কোনো আক্ষেপ নেই, ‘আমি আসলে তানির ওপর কোনোদিন কোনো চাপ প্রয়োগ করিনি। তানি এখন যুক্তরাজ্যে থাকে, তিন সন্তান, ভালো পরিবার এবং স্বামীকে নিয়ে সুখে আছে।’
সাবিনা ইয়াসমীন বললেন, ‘সন্তানদের সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের। মেয়ে ব্যাংকে ভালো করছে, ছেলে লন্ডনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে— এতেই আমি সন্তুষ্ট। অনেক কিংবদন্তি শিল্পীর সন্তানই বাবা-মায়ের পেশায় আসেননি। তাই সন্তান বাবা-মায়ের মতো শিল্পী না হলে সেটাকে অস্বাভাবিক মনে করি না।’
সন্তানদের পেশা নির্বাচনে কোনো চাপ দেননি জাহিদ হাসান। তার বক্তব্য, ‘মানসিক চাপে কখনোই কোনো
সন্তান বড় হতে পারে না। এটা আরও সমস্যার সৃষ্টি করে।’ মৌ বললেন, ‘মেয়ে ছোটবেলায় আমার সঙ্গে কিছু কাজ করলেও সেটি অনেকটা জোর করেই হয়েছিল। ছেলে খেলাধুলার দিকে বেশি আগ্রহী। মিডিয়ায় আসার আগ্রহ নেই।’
মিশা বললেন, ‘আমাদের জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন আমাদের দুই সন্তান। আমি চাই, দুই ছেলে বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আসুক। বিদেশে হয়তো বেশি আয় করা যায়; কিন্তু দেশেও ভালোভাবে থাকা সম্ভব এবং দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’








