এখন গান বানানো হয় খাওয়ানোর জন্য

সৈয়দ আব্দুল হাদী - মহসিন আহমেদ কাউসার
বরেণ্য সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পান্থ আফজাল
এখন কেমন আছেন?
খুব ভালো যে আছি তা নয়। বয়স তো অনেক হলো। করোনার সময় থেকেই শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। সবকিছু কেমন ভুলে যাই। কিছুই মনে রাখতে পারি না।
গান থেকে অবসর নিয়েছেন শুনেছি; কিন্তু শিল্পীর কি কখনো অবসর নেওয়া হয়?
অবসর নেওয়া মানে পেশাদারি গান ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু নিজের জন্য তো গান করতে হয়। না হলে বেঁচে থাকব কী করে! শিল্পী তো এক অর্থে সারাজীবনই গান করে। আমিও নিজের মনে সারা দিনই গুনগুন করি।
পেশাদারি গান ছেড়ে দেওয়ার মূল কারণ কী?
করোনার কারণে আমার শারীরিক কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে আগের মতো গান করতে পারি না। সেজন্যই ভাবলাম, যা করেছিলাম সে ইমেজটুকুই আমার থাক। এ ইমেজ নষ্ট করে লাভ নেই। সেজন্য এখন আর প্রকাশ্যে গান করি না। আরেকটি কথা, আমার পুরনো গানের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে শ্রোতাদের ফাঁকি দিতে চাই না। তবে হ্যাঁ, চেষ্টা করলে হয়তো গান আবারও করতে পারব। আরেকটি কারণ আছে যেটি উল্লেখ করতে চাই না।
নিজের গান শোনেন?
নিজের গান আমি শুনি না। নিজের গান শুনলে মনে হয়, ধ্যাত! ভালো গান গাইতে পারি নাই। আরও ভালো গাওয়া উচিত ছিল।
এখনকার গানে শিল্পবোধ নেই। গান সৃষ্টি হয় ভাইরালের লক্ষ্যে। গান বানানো হয় খাওয়ানোর জন্য। এসব থেকে বের হতে পারলে গান টিকে থাকবে, না হলে হবে অনাসৃষ্টি
এখনকার গান নিয়ে আপনার অভিমত কী?
এখনকার গানে শিল্পবোধ নেই। গান সৃষ্টি হয় ভাইরালের লক্ষ্যে। গান বানানো হয় খাওয়ানোর জন্য। এসব থেকে বের হতে পারলে গান টিকে থাকবে, না হলে হবে অনাসৃষ্টি। তবে এর মধ্যেই অনেক ভালো গানও কিন্তু হয়।
একসময় দুরন্তপনায় দিন কেটেছে...
শৈশব-কৈশোরের মতো এত সুন্দর
সময় জীবনে ফিরে আসে না।
শৈশবে কোনো চাওয়া-পাওয়ার
হিসাব থাকে না।
তখন একমাত্র ভাবনা শুধুই আনন্দ। তবে আমি মনে
করি, প্রত্যেক বয়সেরই কটা নিজস্ব আনন্দ আছে। আমার এ
বয়সেও এটি প্রযোজ্য। আনন্দ
না থাকলে তো মানুষের বেঁচে
থাকার বাসনাও থাকে না।
এ বয়সে এসে কি একা লাগে?
একাকিত্ব? হ্যাঁ, তা তো লাগবেই। এ বয়সের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা একাকিত্ব। তবে এটি চাইলে আনন্দময় করে তোলা যায়।
এখন সময় কাটে কীভাবে?
টিভি দেখি অনেক। অন্য শিল্পীদের গান শুনি আর বই পড়ি। আমি প্রকৃতিপ্রেমী। প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে ভালো লাগে।
জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া, অপ্রাপ্তি বা হতাশা আছে?
পৃথিবীতে এমন খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি বলবেন তার সবই প্রাপ্তি অথবা পুরোটাই অপ্রাপ্তি। তবে সব শিল্পীর মধ্যেই একটা অতৃপ্তি কাজ করে। এটিই একজন শিল্পীকে নতুন কিছু সৃষ্টিতে বা নতুন সৃজনশীলতার দিকে ধাবিত করে।
তবুও শিল্পীর অতৃপ্তি থাকবেই আজীবন। আমার জীবনে প্রাপ্তিও আছে, অপ্রাপ্তিও আছে। এ হিসাবই করি নাই কোনটি বেশি, কোনটি কম। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি বাদ দিয়ে মানুষের শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসা পেয়েছি। ভালোবাসায় যদি শ্রদ্ধা না থাকে তাহলে সে ভালোবাসা চাই না। আবার যে শ্রদ্ধার সঙ্গে ভালোবাসা নেই, সেটিও চাই না। আমি খুবই ভাগ্যবান, মানুষের কাছ থেকে দুটিই পেয়েছি।
মৃত্যু নিয়ে ভাবেন? যখন আপনি থাকবেন না, কিন্তু আপনার কাজ থেকে যাবে...
আমি থাকব না; কিন্তু আমার কর্ম বেঁচে থাকবে– একজন শিল্পীর জন্য এটি সবচেয়ে বড় আনন্দ। যেকোনো মানুষের জন্যই এটি বড় প্রাপ্তি।


