অভিবাসন নিয়ে দেশে প্রথম চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ‘হাউ ডু ইউ ডু’

সংগৃহীত ছবি
প্রথমবারের মতো দেশে আয়োজিত অভিবাসন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বিষয়ক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা ও উৎসব ‘মাইগ্রেশন ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’- এর পুরস্কার বিতরণ করা হয়েছে। এতে জাতীয় বিভাগে প্রথম হয়েছে আবির ফেরদৌস মুখরের ‘হাউ ডু ইউ ডু’ এবং আন্তর্জাতিক বিভাগে সেরা হয়েছে তুরস্কের পরিচালক আদার বারান ডেগারের ‘দ্য কোল্ড’।
জাতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে সৈয়দ সাহিল ও রাকায়েত রাব্বী নির্মিত ‘মাটি’ এবং তৃতীয় হয়েছে ইফফাত রওনাক প্রমির ‘দ্য লাস্ট প্যাসেজ’। আন্তর্জাতিক বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছে ইরানের পরিচালক মোসায়েব হানাইয়ের ‘ওভারলোড’ এবং তৃতীয় হয়েছে ভেনেজুয়েলার পরিচালক রিকার্দো মুনোজ সিনিয়রের ‘অ্যান আইল্যান্ড’।
আজ বুধবার রাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ীদের সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার যে পরিস্থিতি, তাতে অনেক সময় দিকবিদিকশূন্য হয়ে এবং আশপাশের হাতছানির কারণে আমাদের তরুণেরা বিদেশে পাড়ি জমায়। তারা যাওয়ার আগে ও পরে প্রতারিত হয়। এরপরও কোনো খরচ ছাড়াই রেমিট্যান্সের মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা সরকারের হাতে আসে, তা অনেক মূল্যবান। কারণ আমরা অনেকটাই আমদানিনির্ভর। সে জন্য বৈদেশিক মুদ্রা দরকার। আর সেই বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান আমাদের দেশের সেই মানুষগুলো, যারা বিদেশে যাচ্ছেন। এই প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে না পারলে আমাদের বড় সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে। যারা যেতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য সহজ পথ বাতলে দেওয়া, খরচ কমিয়ে আনা এসব নিশ্চিত করতে হবে। তবে দিনশেষে মনে রাখতে হবে— অভিবাসন শুধু পরিসংখ্যান নয়, মানুষের গল্প। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগে তথ্য মন্ত্রণালয় পাশে থাকতে চায়।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালেয়র অতিরিক্ত সচিব সাইফুল হক চৌধুরী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ বিদেশে যায়, কিন্তু সেই যাওয়ার পথটা খুব সুখকর নয়। আশার গল্প যেমন আছে, তেমনি দুঃখ-বঞ্চনার গল্পও আছে। আপনারা যে গল্পগুলো তুলে এনেছেন, তা সবই সত্য ঘটনা। এখন সেগুলো সাধারণ মানুষের সামনে তুলে আনতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেছেন, শ্রম অভিবাসনের দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি স্বজনদের ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে সংগ্রাম, ত্যাগ ও স্বপ্নের গল্প। অন্যদিকে, ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষ দেশগুলোর একটি। একইভাবে বঙ্গোপসাগর হয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে বহু বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা প্রাণ হারাচ্ছেন। বিদেশে কাজের সুযোগের আশায় গিয়ে অসংখ্য মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এসব বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই আমরা এই চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করেছি।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহযোগিতায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম বাস্তবায়িত ‘ম্যাস ক্যাম্পেইন টু কমব্যাট হিউম্যান ট্র্যাফিকিং অ্যান্ড পিপল স্মাগলিং’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ বছর প্রথমবারের মতো ‘মাইগ্রেশন ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’ আয়োজনের উদ্যোগ নেয় ব্র্যাক।
গত ১ এপ্রিল গুগল ফর্ম ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্ল্যাটফর্ম ফিল্মফ্রিওয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র আহ্বান করা হয়। বিশ্বের ২৪টি দেশ থেকে এক হাজারেরও বেশি চলচ্চিত্র জমা পড়ে। তিন মাসব্যাপী এ আয়োজনে নির্মাতাদের জন্য ছয়টি মেন্টরশিপ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৫৭টি চলচ্চিত্র বাছাই করা হয়। পরে জাতীয় বিভাগে ১৩টি এবং আন্তর্জাতিক বিভাগে ১০টিসহ মোট ২৩টি চলচ্চিত্র চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়।
বাংলাদেশ ছাড়াও আফগানিস্তান, ব্রাজিল, কানাডা, কোস্টারিকা, সাইপ্রাস, মিসর, ফ্রান্স, ভারত, ইরান, ইসরায়েল, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, তুরস্ক, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা ও ভিয়েতনাম থেকে চলচ্চিত্র পাঠিয়েছেন নির্মাতারা।
ব্র্যাক জানায়, বিদেশে গিয়ে জীবন বদলের স্বপ্ন কীভাবে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, উত্তাল সমুদ্রে কাঠের নৌকায় দিনের পর দিন না খেয়ে থাকা, অসুস্থ মানুষকে সাগরে ফেলে দেওয়ার ভয়াবহতা, দালালচক্রের প্রতারণা এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেঁচে ফেরার সংগ্রাম এমন হৃদয়বিদারক বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প উঠে এসেছে উৎসবে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোতে। চলচ্চিত্রগুলো অভিবাসন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মানবিক সংকটকে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতেও অভিবাসন, মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তরুণ নির্মাতাদের সম্পৃক্ত করে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে জনসচেতনতা আরও কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।







