১৬ বার ছুরিকাঘাতের পর নিশ্চিত করা হয়েছিল অন্তঃসত্ত্বা অভিনেত্রীর মৃত্যু

শ্যারন টেট
ঘটনাটি ১৯৬৯ সালের ৮ আগস্টের। লস অ্যাঞ্জেলেসের লস ফেলিজ ও বেনেডিক্ট ক্যানিয়নের অভিজাত এলাকাগুলো যখন রাতের শান্তিনিবিড় ঘুমে ঢলে পড়েছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
হলিউডের উদীয়মান তারকা ও অস্কার মনোনীত পরিচালক রোমান পোলানস্কির আট-সাড়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী শ্যারন টেট এবং তার চার বন্ধুকে সেই রাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
কিন্তু সবচেয়ে করুণ ও বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে বাড়ির ভেতরে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল— সেই বাড়ির বাসিন্দা শ্যারন টেট বা তার বন্ধুদের সঙ্গে খুনিদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। তারা স্রেফ ভুল সময়ে এক ব্যর্থ সংগীতশিল্পীর প্রতিহিংসার ঠিকানায় উপস্থিত ছিলেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ১০০৫০ সিয়েলো ড্রাইভের নির্জন ও বিলাসবহুল বাংলোটি মূলত ছিল খ্যাতিমান মার্কিন সংগীত প্রযোজক টেরি মেলচারের। সেই সময় সংগীতজগতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে আকুল হয়ে ঘুরে বেড়ানো চার্লস ম্যানসন নামের এক উন্মাদ ব্যক্তি টেরি মেলচারের সঙ্গে দেখা করেন। ম্যানসন নিজেকে বড় সংগীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু টেরি মেলচার তার ডেমো ট্র্যাক শুনে তাকে অ্যালবাম দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এই প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে পারেননি চরম মানসিক ভারসাম্যহীন ও মাদকাসক্ত ম্যানসন। মেলচারের ওপর তার ক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে মেলচার ওই বাড়িটি ছেড়ে দিলে তা ভাড়া নেন চলচ্চিত্র নির্মাতা রোমান পোলানস্কি এবং তার গর্ভবতী স্ত্রী শ্যারন টেট। কিন্তু ম্যানসনের মাথায় সিয়েলো ড্রাইভের সেই ঠিকানাই হলিউডের অভিজাতদের প্রতীক হিসেবে গেঁথে যায়।
ঘটনার রাতে রোমান পোলানস্কি ইউরোপে একটি ছবির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সাড়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা শ্যারন টেট তার তিন বন্ধু— খ্যাতনামা হেয়ার স্টাইলিস্ট জে সেব্রিং, হলিউড চিত্রনাট্যকার ভয়চেখ ফ্রাইকোভস্কি এবং কফি সাম্রাজ্যের ধনী উত্তরাধিকারী অ্যাবিগেইল ফোলগারকে নিয়ে রাতে আড্ডা শেষে সিয়েলো ড্রাইভের বাড়িতে ফেরেন।
রাত ১২টা বাজার পরপরই চার্লস ম্যানসনের নির্দেশে তার অন্ধ অনুসারী ‘ম্যানসন ফ্যামিলি’র চার সদস্য— টেক্স ওয়াটসন, সুসান অ্যাটকিন্স, প্যাট্রিসিয়া ক্রেনউইঙ্কেল এবং লিন্ডা কাসাবিয়ান পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইন কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়ির গেটে থাকা ১৮ বছর বয়সী স্টিভেন প্যারেন্ট নামের এক তরুণকে প্রথম গুলি করে হত্যা করা হয়।
এরপর ঘরের ভেতরে থাকা সবাইকে বন্দি করে শুরু হয় এক দীর্ঘমেয়াদি নারকীয় তাণ্ডব। জে সেব্রিং প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করা হয়। ফ্রাইকোভস্কি ও ফোলগার প্রাণ বাঁচাতে উঠানে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের তাড়া করে ৫১ বার ও ২৮ বার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। সবশেষে ২৬ বছর বয়সী গর্ভবতী শ্যারন টেট নিজের অনাগত সন্তান 'পল রিচার্ড'-এর জীবনের জন্য তাদের কাছে ভিক্ষা চান। কিন্তু পাষণ্ড খুনিরা তাকে ১৬ বার ছুরিকাঘাত করে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে ওঠে। চলে যাওয়ার আগে শ্যারন টেটের শরীরের রক্ত দিয়ে প্রধান দরজায় বড় বড় অক্ষরে লিখে দিয়ে যায়—‘পিগ’ (শূকর)।
পরদিন সকালে গৃহকর্মী উইনিফ্রেড চ্যাপম্যান কাজে এসে রক্তাক্ত লাশের পাহাড় দেখে আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যান। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই সমগ্র হলিউডে এক নজিরবিহীন আতঙ্ক গ্রাস করে। কে বা কারা এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা বুঝতে পুলিশ শুরুতেই পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
আতঙ্কের রেশ কাটতে না কাটতেই, ঠিক তার পরের রাতে ম্যানসনের নির্দেশে তার দল সুপার মার্কেট এক্সিকিউটিভ লিনো লাবিয়াঙ্কা এবং তার স্ত্রী রোজমেরি লাবিয়াঙ্কাকে তাদের নিজেদের বাড়িতে একইভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং দেয়ালে রক্ত দিয়ে বিটলস গানের কথা থেকে নেওয়া ‘হেল্টার স্কেল্টার’ লিখে রেখে আসে।
দুটি ভিন্ন হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য বুঝতে গিয়ে পুলিশ যখন প্রায় পথ হারিয়ে ফেলেছিল, তখন অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ম্যানসন ফ্যামিলির সদস্য সুসান অ্যাটকিন্স কারাগারে নিজের অন্য বন্দি সঙ্গীদের কাছে গর্ব করে শ্যারন টেটকে হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। সেই বন্দিরা তথ্যটি পুলিশকে জানালে উন্মোচিত হয় ম্যানসনের এই নারকীয় সাম্রাজ্য।
১৯৭১ সালে দীর্ঘ শুনানির পর চার্লস ম্যানসন, টেক্স ওয়াটসন, সুসান অ্যাটকিন্স, প্যাট্রিসিয়া ক্রেনউইঙ্কেল এবং লেসলি ভ্যান হউটেনকে প্রথম মাত্রার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। যদিও ১৯৭২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে সাময়িকভাবে মৃত্যুদণ্ড রদ করায় তাদের শাস্তি রূপান্তরিত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিণত হয়। ২০১৭ সালে ৮৩ বছর বয়সে কারাগারেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চার্লস ম্যানসন।
হলিউডের ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৬৯ সালের ৮ আগস্টের এই একটি রাত সমগ্র আমেরিকার ১৯৬০-এর দশকের ‘হিপ্পি’ যুগের শান্তি ও প্রেমের আদর্শকে চিরতরে হত্যা করেছিল। আর তার কেন্দ্রে ছিল একজন ব্যর্থ গায়কের চরম ঈর্ষা, যে নিজে তারকা হতে না পেরে এক নিষ্পাপ অন্তঃসত্ত্বা তারকা ও তার বন্ধুদের রক্তে লিখে গিয়েছিল নিজের বিকৃত নাম।
সূত্র : এনডিটিভি








