হলিউড কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে ভবিষ্যতের ককপিটকে

সংগৃহীত ছবি
রুপালি পর্দার ‘আয়রন ম্যান’ কিংবা ‘ব্লেড রানার’ সিনেমার সেই চোখ ধাঁধানো প্রযুক্তির বিমানগুলো এখন আর কেবল রূপকথার গল্পে আটকে নেই। সান ফ্রান্সিসকো শহরের নামি ‘টেরিটরি স্টুডিও’র প্রধান ডিজাইনার মার্টি রোম্যান্স সম্প্রতি এক অদ্ভুত তথ্যের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন।
তিনি দাবি করছেন, ‘হলিউডের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির সিনেমাগুলো আসলে আমাদের বাস্তব বিজ্ঞানীদের জন্য এক একটা মস্ত বড় গবেষণাগার হিসেবে কাজ করে চলেছে। সিনেমার পর্দায় দেখানো সেই বোতাম ছাড়া ইশারায় চলা বিমান কিংবা কাল্পনিক সব ককপিট দেখেই এখনকার বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতের সত্যিকারের যুদ্ধবিমান তৈরির এক নিখুঁত ব্লুপ্রিন্ট পেয়ে যাচ্ছেন।’
ডিজাইনারদের মতে, মানুষের তৈরি যেকোনো কম্পিউটার সিস্টেমের সবচেয়ে বড় গুণ হলো তার স্পষ্টতা, যা আসলে ককপিটে পাইলটের জীবন বাঁচানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। পাইলটরা যদি বিমানের ভেতরের জটিল ভাষা সহজে পড়তে না পারেন, তবে তারা সেই যন্ত্রকে কোনো দিনই মন থেকে বিশ্বাস করতে পারবেন না।
সিনেমার পর্দায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য দর্শকরা যে জটিল পর্দাগুলো দেখেন, সেগুলো কিন্তু কোনো সাধারণ মানুষও বিনা প্রশিক্ষণে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে ফেলেন। ঠিক একই রকম এক নির্মম ও কঠিন নিয়মের মধ্য দিয়ে মহাকাশ বা বিমান তৈরির জটিল শিল্পকেও সবসময় পার হতে হয়। তথ্য আর সফটওয়্যারের সাগরে পাইলটরা যাতে হারিয়ে না যান, সেজন্য বিমানের ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থাটি বড্ড দ্রুত ও নির্ভুল হওয়া প্রয়োজন।
লকহিড মার্টিন কোম্পানির তৈরি বিখ্যাত পঞ্চম প্রজন্মের ‘এফ-৩৫ লাইটনিং ২’ যুদ্ধবিমানটি এই আধুনিক সফটওয়্যারের সবচেয়ে বড় এক চমৎকার উদাহরণ। আগের যুগের বিমানগুলো যেখানে কেবল বাতাসের গতির ওপর ভিত্তি করে লোহা দিয়ে তৈরি হতো, সেখানে এফ-৩৫ বিমানটিকে শুরু থেকেই এক মস্ত বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
এই বিমানের পাইলটদের মাথার হেলমেটটি কাচের তৈরি এক বিশেষ পর্দা বা ‘ভাইজর’ দিয়ে তৈরি যা বাইরের স্ক্রিনের ঝামেলা ছাড়াই আকাশে ওড়ার সব তথ্য পাইলটের চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে। গতি, উচ্চতা কিংবা শত্রুর ঠিকানা— সবই পাইলটের চোখের নড়াচড়ার সাথে সাথে এই জাদুকরি হেলমেটের পর্দায় ভেসে ওঠে। এই বিবর্তনটি আসলে নব্বইয়ের দশকের এক পুরনো ভক্সওয়াগেন গাড়ি চালানো আর ২০২৫ সালের আধুনিক টেসলা গাড়ি চালানোর মধ্যকার এক বিশাল পার্থক্যের মতো মনে হতে পারে।
তবে ককপিটের ভেতরে তথ্যের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তা পাইলটের জন্য এক মস্ত বড় বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসতে পারে। সিনেমার পর্দায় টনি স্টার্কের ‘আয়রন ম্যান’ সাজের ভেতরের হিজিবিজি গ্রাফিকস দেখতে বড্ড চমৎকার লাগলেও আসল আকাশে কিন্তু এমন অতিরিক্ত নড়াচড়া পাইলটকে একদম বিভ্রান্ত করে দেবে।
সিস্টেমগুলো বড্ড বেশি মসৃণ ও স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠলে পাইলটদের ভেতরে এক ধরনের অলসতা বা মিথ্যা নিরাপত্তার জন্ম হতে পারে, যা মাঝ আকাশে চরম বিপদ ডেকে আনে। এই কারণেই বিমান মাটিতে নামার মতো কঠিন সময়ে কম্পিউটারের পর্দাগুলোকে একদম সহজ ও ফাঁকা করে দেওয়া হয় যাতে পাইলটের ওপর বাড়তি কোনো মানসিক চাপ তৈরি না হয়।
এই আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এখন কেবল আকাশেই নয়, বরং অডি কোম্পানির ‘অ্যাকটিভস্ফিয়ার’ নামক কনসেপ্ট কারের হাত ধরে আমাদের মাটির গাড়িতেও এসে লেগেছে। এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি বা এক্সআর প্রযুক্তির মাধ্যমে গাড়িগুলো এখন চালকের চোখের ইশারা আর হাতের নাড়াচড়া বুঝেই রাস্তার সব গোপন বিপদের কথা আগে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছে।
তবে স্ক্রিনের দুনিয়া যত সুন্দরই হোক না কেন, না তাকিয়ে অনুভব করা যায় এমন একটা আসল বোতাম বা নব কিন্তু এখনো কাচের ভেতরের এক হাজার মেন্যুকে অনায়াসে টেক্কা দিতে পারে। মানুষের মনস্তত্ত্ব যেহেতু কম্পিউটারের গতিতে বিবর্তিত হয় না, তাই চোখ সবসময় ক্লান্ত হবেই এবং বিশ্বাস জিনিসটাকেও কষ্ট করে অর্জন করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মানুষের বিচারবুদ্ধি আর আসল নিয়ন্ত্রণকে সম্মান জানায় এমন সহজ প্রযুক্তিই কিন্তু এই পৃথিবীতে আসল রাজত্ব করবে।






