বিতর্কিত ধর্মীয় নেত্রী অ্যানকে নিয়ে ছবি হলিউডে

অ্যান লির চরিত্রে আমান্ডা সাইফ্রিড। ছবি: বিবিসি
ইংল্যান্ডের শিল্পনগরী ম্যানচেস্টারের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এক নারী ধর্মীয় আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। সতেরো শতকের সেই গল্পই আবার আলোচনায় এসেছে হলিউডের নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য টেস্টামেন্ট অব অ্যান লি’-এর মাধ্যমে। ছবিটিতে অ্যান লির চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আমান্ডা সাইফ্রিড, যিনি এর আগে ‘মিন গার্লস’ এবং ‘মামা মিয়া’ সিনেমার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন।
এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম আবার জানতে পারছে সেই নারীর গল্প, যিনি ‘মাদার অ্যান লি’ নামে ইতিহাসে পরিচিত এবং শেকার নামে পরিচিত এক ধর্মীয় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা নেত্রী ছিলেন।
অ্যান লির জন্ম ১৭৩৬ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে। বাবা ছিলেন একজন কামার। বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা অ্যান লি ছিলেন আট সন্তানের একজন। শৈশব থেকেই তিনি দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। জীবিকা নির্বাহের জন্য খুব অল্প বয়সেই বাইরে কাজ করতে হয়। স্থানীয় কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি রান্নার কাজও করতেন ম্যানচেস্টারের একটি হাসপাতালে। তার জীবনের এই শুরুর দিকের তথ্য তুলে ধরেছেন রিচার্ড ফ্রান্সিস, যিনি ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেষ্টারের সাবেক অধ্যাপক এবং অ্যান লির জীবনীগ্রন্থ ‘অ্যান দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর লেখক।
অ্যান লির ব্যক্তিগত জীবনও ছিল গভীর ট্র্যাজেডিতে ভরা। ছাব্বিশ বছর বয়সে একজন কামারকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে চারটি সন্তানের জন্ম হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রত্যেকেই জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়। এই পরপর শোকের ঘটনাগুলো তার মানসিক অবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলে এবং ধীরে ধীরে তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়েন। অনেক গবেষকের মতে, এই ব্যক্তিগত দুঃখই তার ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এ সময়েই অ্যান লি ধর্মীয় একটি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ইংল্যান্ডের বোল্টন শহরের এক দম্পতির মাধ্যমে তিনি একটি আধ্যাত্মিক গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচিত হন। এই দম্পতি আগে কোয়েকারস সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন, কিন্তু পরে তারা একটি আলাদা ধর্মীয় দল গঠন করেন। এই দলটি পরিচিত ছিল ‘শেকিং কোয়াকারস’ বা সংক্ষেপে শেকার নামে। তাদের ধর্মীয় উপাসনার ধরন ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে। উপাসনার সময় তারা চিৎকার করে গান গাইত, নাচত এবং আধ্যাত্মিক উন্মাদনার মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করত। এই অস্বাভাবিক আচরণের কারণেই তাদের ‘শেকার’ নামে ডাকা শুরু হয়।
১৭৭০ সালের দিকে অ্যান লি এই গোষ্ঠীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিজেকে শেকারদের আধ্যাত্মিক মা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার অনুসারীরা তাকে ‘মাদার অ্যান’ নামে সম্বোধন করতে শুরু করে। অনেক অনুসারী বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তিনি আসলে খ্রিস্টের দ্বিতীয় আগমনের প্রতীক। তার প্রচারিত ধর্মীয় দর্শনও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি বিশ্বাস করতেন পৃথিবীর শেষ সময় খুব কাছাকাছি এবং মানুষের উচিত সেই চূড়ান্ত মুক্তির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। তার আন্দোলনের প্রধান নীতির মধ্যে ছিল ব্রহ্মচর্য পালন, যৌথভাবে বসবাস এবং নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা। আঠারো শতকের সমাজব্যবস্থার তুলনায় এই ধারণাগুলো ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল।
অ্যান লি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তার অনুসারীরা তাকে ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে বর্ণনা করতেন। জীবনে বহু কষ্ট ও নির্যাতনের মুখোমুখি হলেও তিনি কখনো পিছু হটেননি। তার ব্যক্তিত্বের প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, অনেক মানুষ তার সামনে পড়তে ভয় পেত। অনেকের বিশ্বাস ছিল, তার মধ্যে এমন একধরনের চৌম্বকীয় শক্তি রয়েছে, যা মানুষকে তার আন্দোলনের দিকে আকৃষ্ট করে।
তবে ম্যানচেস্টারে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র বিতর্কও তৈরি হয়। শেকারদের উন্মত্ত নাচ-গান এবং ধর্মীয় আচার অনেকের কাছে অস্বাভাবিক ও বিরক্তিকর মনে হত। ফলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। একাধিকবার জনতার আক্রমণের শিকার হন অ্যান লি এবং তার অনুসারীরা। এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ভেঙে দেওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি বন্দি ছিলেন ম্যানচেস্টারের হান্টস ব্যাংক এলাকায় অবস্থিত একটি সংশোধনাগারে। এই নিপীড়ন ও শত্রুতার পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অ্যান লি শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৭৭৪ সালে প্রায় দশজন অনুসারীকে নিয়ে আমেরিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন অ্যান। এই দলের মধ্যে তার স্বামী ও বাবা ছিলেন। তারা শেষ পর্যন্ত বসতি স্থাপন করেন আমেরিকার নিউইয়র্কে। তবে আমেরিকায় গিয়েও তিনি বিতর্ক থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি। তাকে গুপ্তচর সন্দেহে কারাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া অনেক পুরুষও প্রশ্ন তুলেছিল যে, একজন নারী কীভাবে এত বড় ধর্মীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেন। কিন্তু এসব বাধা সত্ত্বেও তার অনুসারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
এক সময় শত শত মানুষ তার বসতির কাছাকাছি বসতি স্থাপন শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই শেকার সম্প্রদায় আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
অ্যান লি ১৭৮৪ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান। তবে তার মৃত্যুর পরও শেকার আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং তার অনুসারীরা আন্দোলনটিকে আরও সংগঠিত করে এবং তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই সম্প্রদায়ের অনুসারীর সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি হয়ে যায়।
ইতিহাসবিদ রিচার্ড ফ্রান্সিসের মতে, অ্যান লির দৃঢ়তা এবং সাহসিকতার পেছনে তার জন্মস্থান ম্যানচেস্টারের কঠিন সামাজিক পরিবেশ বড় ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি বলেন, অ্যান লি ছিলেন একেবারে খাঁটি ম্যানচেস্টারের মানুষ—দৃঢ়চেতা, সাহসী এবং কর্তৃত্বের সামনে দাঁড়াতে সক্ষম।
অ্যান লির প্রতিষ্ঠিত শেকার সম্প্রদায় পরবর্তীতে আরও একটি কারণে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। তারা অত্যন্ত সরল, টেকসই এবং নান্দনিক আসবাব তৈরি করত, যা পরে ‘শেকার ফার্নিচার’ নামে পরিচিতি পায়।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হলো নারী-পুরুষ সমতার ধারণা প্রচার করা, যা তার সময়ের অনেক আগেই তিনি সামনে নিয়ে এসেছিলেন।
অ্যান লির এই জীবনধারাই এখন নতুন করে তুলে ধরছে চলচ্চিত্র ‘দ্য টেস্টামেন্ট অব অ্যান লি’। ছবিতে তার চরিত্রে অভিনয় করা আমান্ডা সাইফ্রিড জানান, এই চরিত্রে অভিনয় তাকে মুক্তির অনুভূতি দিয়েছে। কারণ অ্যান লির গল্প খুব বেশি পরিচিত নয়, অথচ তার জীবন ছিল অসাধারণ নাটকীয়তা ও সংগ্রামে ভরা। অভিনেত্রীর ভাষায়, এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তারা মূলত অ্যান লির জীবন ও সংগ্রামকে সম্মান জানাতে চেয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি















