৫৪ বছর পর নতুন রূপে ফিরছে ‘পাকিজা’

‘পাকিজা’র একটি দৃশ্য
পালকিতে করে এসেছিল ছবির ফিল্মের ক্যান! প্রায় ৫৪ বছর আগে ভারতের মুম্বাইয়ের মারাঠা মন্দিরে ‘পাকিজা’র প্রিমিয়ারের সেই দৃশ্য আজও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয়। উপস্থিত ছিলেন পরিচালক কমল আমরোহি, মীনা কুমারীসহ চলচ্চিত্রজগতের অনেক নামি ব্যক্তিত্ব। এবার সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে ঐতিহাসিক সেই ছবিই ফিরছে নতুন রূপে।
দীর্ঘ দুই বছর ধরে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজ শেষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে ‘পাকিজা’। ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ছবিটির পুনরুদ্ধারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
আগামী অক্টোবরে ফ্রান্সের লিয়ঁতে অনুষ্ঠিত ফেস্টিভ্যাল লুমিয়েরে পুনরুদ্ধার করা ‘পাকিজা’র বিশ্ব প্রিমিয়ার হবে। এরপর ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।
‘পাকিজা’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এটি একটি আবেগের নাম। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ছবিটির পরিকল্পনা করেছিলেন কমল আমরোহি। তার স্ত্রী ও মিউজ মীনা কুমারীর সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই মহাকাব্যিক ছবির ভাবনা আসে তার মনে।
লখনৌয়ের নবাবি যুগের শেষ অধ্যায়কে পটভূমি করে নির্মিত ছবিতে মীনা কুমারী অভিনয় করেন তবায়েফ সাহিবজানের চরিত্রে। তার অনবদ্য অভিনয়ই হয়ে ওঠে ছবিটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
তবে ‘পাকিজা’ নির্মাণের পথ ছিল নানা বাধায় পূর্ণ। প্রযুক্তিগত সমস্যা, ব্যক্তিগত টানাপড়েন, বাজেট সংকট, অভিনয়শিল্পী পরিবর্তন এবং চিত্রনাট্যে একাধিক সংশোধনের কারণে ছবিটির নির্মাণ বারবার থমকে যায়। ১৯৫৬ সালে সাদা-কালোয় শুটিং শুরু হলেও ১৯৫৮ সালে তা ইস্টম্যানকালারে পরিবর্তন করা হয়। সব মিলিয়ে ছবিটি নির্মাণে সময় লাগে প্রায় ১৫ বছর।
১৯৬৪ সালে ব্যক্তিগত মতবিরোধের কারণে কমল আমরোহি ও মীনা কুমারীর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর প্রভাব পড়ে ‘পাকিজা’র নির্মাণেও। এরপর ১৯৬৮ সালে মীনা কুমারীর লিভার সিরোসিস ধরা পড়লে ছবিটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
তবে শেষ পর্যন্ত ছবির কাজ থেকে সরে যাননি মীনা কুমারী। সুনীল দত্ত ও নার্গিস পুরনো ফুটেজ দেখিয়ে তাকে বাকি শুটিং শেষ করতে উৎসাহিত করেন। অসুস্থ শরীর নিয়েই সেটে ফিরে আসেন তিনি।
ছবিটির নির্মাণযাত্রায় আরও বড় ধাক্কা আসে কিংবদন্তি চিত্রগ্রাহক জোসেফ উইরশিংয়ের মৃত্যুতে। ১৯৬৭ সালে তিনি মারা যান। তার তৈরি ভিজ্যুয়াল সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখতে ভারতের একাধিক শীর্ষ চিত্রগ্রাহক মিলে ছবিটির বাকি অংশের কাজ সম্পন্ন করেন।
১৯৬৮ সালে মারা যান সুরকার গুলাম মোহাম্মদ। ছবির কালজয়ী গানগুলোর সুর দেওয়ার পর অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব নেন কিংবদন্তি সুরকার নৌশাদ।
অবশেষে ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় ‘পাকিজা’। তখন ভারতীয় সিনেমায় পরিবর্তনের সময় চলছিল। পরিশীলিত ও উর্দুঘেঁষা স্টুডিও মেলোড্রামার জায়গা করে নিচ্ছিল শহুরে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র। সেই পরিবর্তনের সময়েও ‘পাকিজা’ দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয় এবং বক্স অফিসে বড় সাফল্য পায়।
তবে ছবির মুক্তির মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ৩১ মার্চ মারা যান মীনা কুমারী। দীর্ঘ কয়েক দশক পর এবার সেই ‘পাকিজা’কে নতুন করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুনরুদ্ধারের সময় ছবিটির মূল ক্যামেরা নেগেটিভ পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটি প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছিল। অন্যান্য ফিল্ম উপাদানেও ছিল রঙ বিবর্ণ হয়ে যাওয়া, আঁচড় ও ছত্রাকের দাগ।
পুরনো ফিল্ম স্টিল ও সংরক্ষিত বিভিন্ন উপাদান উদ্ধার করে সেগুলোর সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে ছবিটির পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ। এ কাজে রামনর্ড ল্যাব থেকে পাওয়া ইন্টারপজিটিভ ও সিনেমাস্কোপ প্রিন্ট এবং এনএফডিসি-ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়ায় সংরক্ষিত কালার রিভার্সাল ইন্টারনেগেটিভও ব্যবহার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ১৫৩ মিনিটের এই কালজয়ী চলচ্চিত্রকে নতুন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এবার মীনা কুমারীর অমর ‘সাহিবজান’ এবং কমল আমরোহির স্বপ্নের ‘পাকিজা’ ফিরছে বড় পর্দায়। শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের সামনে ফের উন্মোচিত হবে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের এই অনন্য অধ্যায়।







