ফ্লপ থেকে সুপারহিট, ইমতিয়াজ আলীর সিনেমার রহস্য কী?

সংগৃহীত ছবি
ইমতিয়াজ আলী, নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পর্দার সব জাদুকরী গল্প। তার সিনেমা মানেই জীবনের খোঁজে চেনা ছন্দ হারিয়ে ফেলা কিছু মানুষের গল্প।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে তার নতুন সিনেমা ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’। দিলজিৎ দোসাঞ্জ, নাসিরুদ্দিন শাহ, শর্বরী ও বেদাং রায়না অভিনীত এই সিনেমাটি প্রথম সপ্তাহে বক্স অফিসে খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও, দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে এর জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছে।
আর এর মাধ্যমেই বলিউডে আবার পুরনো সেই আলোচনা শুরু হয়েছে— ইমতিয়াজ আলীর সিনেমা কেন মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে দর্শক বোঝে না, বরং হিট হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়?
ইমতিয়াজ আলীর আলাদা এক ধরন আছে। তিনি আর দশজন পরিচালকের মতো প্রথম সপ্তাহের কোটি কোটি টাকার ব্যবসার পেছনে ছোটেন না। তিনি এমন সিনেমা বানান, যা মানুষের মনের ভেতর অনেক দিন ধরে থেকে যায়।
তার নতুন সিনেমা ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ দেশভাগের পটভূমিতে তৈরি একটি প্রেমের গল্প মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে নিজের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্বকে খোঁজার এক দারুণ লড়াই। সিনেমাটি দেখে হল থেকে বের হওয়ার পর দর্শকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট করছেন। আর এই ধীরগতির সাফল্যই মনে করিয়ে দিচ্ছে ইমতিয়াজের আগের সিনেমাগুলোর কথা।
২০১১ সালে যখন রণবীর কাপুরের ‘রকস্টার’ মুক্তি পেয়েছিল, তখন অনেক নামী সমালোচক সিনেমাটির নেতিবাচক রিভিউ দিয়েছিলেন। অথচ আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ‘রকস্টার’ ভারতের সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সেরা কাল্ট ক্লাসিক।
একই ঘটনা ঘটেছিল ২০১৫ সালের রণবীর-দীপিকার ‘তামাশা’ সিনেমার ক্ষেত্রেও। মুক্তির সময় বক্স অফিসে সিনেমাটি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কিন্তু আজ করপোরেট লাইফের একঘেয়েমি আর মানসিক অবসাদে ভোগা তরুণদের কাছে ‘তামাশা’ জীবনের এক বড় অনুপ্রেরণা। ফেসবুক-ইউটিউবের কমেন্ট বক্সে এখন হাজার হাজার মানুষ লেখে, ‘তামাশা সিনেমার গভীরতা আমরা মুক্তির পাঁচ বছর পর বুঝতে পেরেছি!’
ইমতিয়াজ আলীর সিনেমার চরিত্রগুলো কখনো নিখুঁত বা সুপারহিরো হয় না। ‘রকস্টার’-এর জর্ডান, ‘তামাশা’-র বেদ, ‘হাইওয়ে’-র বীরা কিংবা ‘জাব উই মেট’-এর আদিত্য— সবাই জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে এসে থমকে যাওয়া মানুষ। তাদের সিনেমায় প্রেমটা আসল নয়, আসল হলো প্রেমের উসিলায় নিজের ভেতরের আসল মানুষকে খুঁজে পাওয়া।
ইমতিয়াজ আলী একবার বলেছিলেন, ‘জাব উই মেট’ কেবল একটা প্রেমের গল্প ছিল না, এটা ছিল মানসিক দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি মানুষের এক হওয়ার জার্নি।
ইমতিয়াজের সিনেমার সবচেয়ে বড় ম্যাজিক হলো, এটি একেক বয়সের মানুষের কাছে একেক রকম মনে হয়। যেমন— ২০ বছর বয়সের একটা ছেলে যখন ‘তামাশা’ দেখবে, তার কাছে এটা শুধু একটা রোমান্টিক সিনেমা মনে হবে। ৩০ বছর বয়সে যখন সে চাকরি জীবনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সিনেমাটি আবার দেখবে, তখন সে নিজের জীবনের সংকটের মিল খুঁজে পাবে। আর ৪০ বছর বয়সে দেখলে মনে হবে— ইশ, সমাজের চক্করে পড়ে আমি নিজের ভেতরের আসল মানুষটাকেই মেরে ফেলেছি!
ইমতিয়াজ আলী প্রথম সপ্তাহের বক্স অফিস কালেকশনের জন্য সিনেমা বানান না। তিনি সিনেমা বানান ওটিটির মাঝরাতের একাকী প্রহরে দেখার জন্য, বন্ধুদের সঙ্গে গভীর রাতে জীবন নিয়ে আড্ডার জন্য কিংবা ইনস্টাগ্রামের ক্যাপশনে আবেগের কথা লেখার জন্য।
ইমতিয়াজ আলীর সিনেমাগুলো খুব শান্তভাবে আপনার মনের এক কোণে জায়গা করে নেয় এবং ঠিক সময়ে আপনাকে কাঁদিয়ে বা হাসিয়ে হয়ে ওঠে কাল্ট ক্লাসিক।





