ঘরে চলছিল এসি-টিভি, পচছিল লাশ, কঙ্গনার সহ-অভিনেত্রীর মৃত্যু ঘিরে রহস্য

কৃতিকা চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
বাইরে থেকে তালা মারা বন্ধ ঘর। ভেতরে তখনো একাধারে চলছে টেলিভিশন আর এয়ারকন্ডিশনার। মুম্বাইয়ের অন্ধেরি পশ্চিমের শ্রী ভৈরবনাথ সোসাইটির ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে আসা তীব্র দুর্গন্ধ যখন প্রতিবেশীদের অতিষ্ঠ করে তুলল, তখন দরজা ভেঙে পুলিশ যা দেখল, তা যেকোনো থ্রিলার সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়।
বিছানায় পড়ে আছে ২৭ বছর বয়সী উঠতি অভিনেত্রী ও মডেল কৃতিকা চৌধুরীর ক্ষতবিক্ষত, পচন ধরা নিথর দেহ। পাশে পড়ে আছে রক্তমাখা লোহার তৈরি ‘ব্রাস নাকল’ আর অজ্ঞাত কিছু সাদা পাউডার।
২০১৩ সালে কঙ্গনা রানাউতের ‘রাজ্জো’ সিনেমায় সহ-অভিনেত্রী এবং ‘সাবধান ইন্ডিয়া’র মতো ক্রাইম শোতে অভিনয় করা কৃতিকার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে পুলিশ যা উদ্ধার করল, তা পুরো বিনোদন বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
২০১৭ সালের ১২ জুন উদ্ধার হওয়া লাশটির ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, অন্তত তিন-চার দিন আগেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। মাথায় ভারী বস্তু দিয়ে সজোরে তিনটি আঘাত করে ঘাতকরা।
তবে পুলিশকে ফাঁকি দিতে এবং লাশের পচন ধীরগতি করতে হত্যাকারীরা নিখুঁত চাল চেলেছিল। তারা কৃতিকাকে খুন করে এসি এবং টিভি চালু রেখে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে পালিয়ে যায়, যাতে বাইরে থেকে মনে হয় ঘরের ভেতর কেউ না কেউ হয়তো স্বাভাবিকভাবেই আছে।
হত্যাকারীরা নিখুঁত পরিকল্পনা করলেও একটি মস্ত বড় ভুল করে ফেলে। কৃতিকার রক্তে ভেসে যাওয়া নিজের পরা শার্টটি খুনি ফ্ল্যাটের ভেতরেই ফেলে রেখে যায়।
এ ছাড়া বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার দিন রাতে দুজন অজ্ঞাত পুরুষকে ফ্ল্যাট থেকে বের হতে দেখা যায়। সেই রক্তমাখা শার্টের ডিএনএ এবং পুলিশের খবরের ওপর ভর করে পানভেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শাকিল নাসিম ও বাসুদেব নামের দুই ব্যক্তিকে।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মূল অভিযুক্ত শাকিল নাসিম একজন মাদক ব্যবসায়ী। এক বছর আগে কৃতিকাকে মাদক সরবরাহের বিনিময়ে পাওনা ছিল মাত্র ৬,০০০ টাকা। দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর বেরিয়ে টাকার চরম সংকটে পড়া নাসিম ৮ জুন রাতে বাসুদেবকে সঙ্গে নিয়ে কৃতিকার ফ্ল্যাটে যায়।
অবাক করার বিষয় হলো, পাওনা টাকা নিয়ে শুরুতেই তাদের কোনো ঝামেলা হয়নি। তারা তিনজন একসঙ্গে গল্প করেন, এমনকি রাতের খাবারও একসঙ্গে খান! খাবারের পর টাকা মেটানো নিয়ে বচসা শুরু হলে ক্ষিপ্ত হয়ে সঙ্গে আনা ‘ব্রাস নাকল’ দিয়ে কৃতিকার মাথায় সজোরে আঘাত করে হত্যা করে নাসিম।
পুলিশ ৬ হাজার টাকার পাওনা আদায়ের জন্য খুনের যে থিওরি সামনে এনেছে, তা মেনে নিতে পারেনি কৃতিকার পরিবার। কৃতিকার ভাই দীপক প্রশ্ন তোলেন, যে ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ নগদ ২২,০০০ টাকা উদ্ধার করে পরিবারের হাতে তুলে দিল, সেই সামান্য ৬,০০০ টাকা শোধ না করার জন্য তার বোন কেন নিজের জীবন বাজি রাখবেন?
উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার থেকে মডেলিং ও অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই আসা কৃতিকার ব্যক্তিগত জীবন ছিল বেশ ঝড়ো। প্রতারক স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ, মাদকাসক্তি এবং মানসিক বিষাদ থেকে অতীতে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি।
তবে মৃত্যুর ঠিক কিছুদিন আগেই এক টিভি সিরিয়ালে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করা কৃতিকা যখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন, তখনই স্রেফ এক অদ্ভুত ও রহস্যময় পরিস্থিতির বলি হয়ে নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ।
সূত্র : এনডিটিভি







