মীনা কুমারীর জন্য রোজা রেখেছিলেন গুলজার!

উপমহাদেশে হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে মীনা কুমারী শুধু একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রী নন, তিনি ছিলেন সংবেদনশীল এক কবি এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর সেই মানুষটির সঙ্গে কবি-গীতিকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক গুলজারের সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা এবং নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের। সময়ের সঙ্গে সেই বন্ধন এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা হয়ে উঠেছিল সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
গুলজার প্রথম মীনা কুমারীকে কাছ থেকে দেখেছিলেন চলচ্চিত্রের সেটে। তার সৌন্দর্য, মার্জিত ব্যবহার, উর্দু ভাষার ওপর অসাধারণ দখল এবং ব্যক্তিত্ব গুলজারকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। পরে একাধিক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাদের বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হয়।
১৯৭১ সালে গুলজার যখন তার প্রথম পরিচালিত ছবি ‘মেরে আপনে’ তৈরি করছিলেন, তখনই মীনা কুমারীকে আনন্দী দেবীর চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। সেই সময় অভিনেত্রী গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। দীর্ঘদিনের মদ্যপানের কারণে তিনি লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হলেও অভিনয়ের প্রতি তার নিষ্ঠা বিন্দুমাত্র কমেনি। গুলজার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘শুটিংয়ের আগে আমি তার পাশে বসে দৃশ্য পড়ে শোনাতাম। তিনি চোখ বন্ধ করে মন দিয়ে শুনতেন। মনে হতো, সংলাপ নয়, পুরো চরিত্রটাকেই নিজের মধ্যে ধারণ করছেন।’
ক্রমশ অসুস্থতা বাড়তে থাকায় রমজান মাসে রোজা রাখা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। কিন্তু মীনা রোজা ভাঙতে রাজি ছিলেন না। তখন গুলজার তাকে বুঝিয়ে বলেন, আপনি ওষুধ খান, আমি আপনার হয়ে রোজা রাখব। এই সওয়াব আমরা দুজনে ভাগ করে নেব।
বন্ধুর জন্য দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মীনা কুমারীর মৃত্যুর পরও বহু বছর ধরে গুলজার রমজানে রোজা রেখেছেন, শুধু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য। ১৯৭২ সালে মীনা কুমারীর মৃত্যুর আগে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদও গুলজারের হাতে তুলে দিয়ে যান। নিজের ব্যক্তিগত ডায়েরি, কবিতা এবং অপ্রকাশিত লেখাগুলির দায়িত্ব তিনি অর্পণ করেছিলেন তার প্রিয় বন্ধুর ওপর।
মীনা ‘নাজ’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। অনেকেই মনে করতেন, তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে হয়তো জীবনের নানা বিতর্কিত ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তবে গুলজার সেই ধারণা নস্যাৎ করে জানিয়েছিলেন, সেখানে কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য নেই। বরং রয়েছে এক সংবেদনশীল মানুষের গভীর অনুভূতি, নিঃসঙ্গতা এবং জীবনকে দেখার এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি।
গুলজারের কথায়, একদিন আমি তার লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশ করতে চাই। সেখানে কেলেঙ্কারি নয়, মানুষ মীনা কুমারীর মন, চিন্তা আর অনুভূতির সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করবে।’ মীনা কুমারী এবং গুলজারের সম্পর্ক কখনো প্রেমের সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং মানবিকতার এমন এক বন্ধন, যা সময়ের বহু বছর পরেও বলিউডের অন্যতম সুন্দর বন্ধুত্বের গল্প হয়ে রয়ে গেছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস







