আরব সিনেমা
- পথচলা দীর্ঘদিনের হলেও বিশ্ব চলচ্চিত্রে মাঝেমধ্যে তীব্র ঝলক দেখিয়ে আবারও আলোচনার আড়ালে পড়ে যাওয়া যেন হয়ে পড়েছিল নিয়তি। তাই বিশেষত বাংলা ভাষায় আরব সিনেমা নিয়ে বোঝাপড়ার প্রয়াস তেমন নজরে পড়ে না। সম্প্রতি পুনরুত্থান ঘটা আরববিশ্বের চলচ্চিত্রের ভাষা, প্রবণতা ও ইতিহাস পরিক্রমা ঘিরে লিখেছেন রুদ্র আরিফ

সিনেমার আরব সফর
উনিশ শতকের শেষভাগে পাশ্চাত্যে যখন সিনেমার উদ্ভাবন ঘটে, আরববিশ্বের বেশিরভাগ ভূখণ্ডই ছিল ইউরোপীয় শাসনাধীন। আরবে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয় ১৮৯৬ সালে— উত্তর আফ্রিকায়, বিশেষত মিসর ও আলজেরিয়ায়; সেগুলো ছিল লুমিয়ের ভাইদের নির্মিত। পরের বছর তিউনিসিয়া ও মরক্কোতে এবং ১৯০০ সালে ফিলিস্তিনে প্রদর্শন ঘটে চলচ্চিত্রের। সিনেমা হল গড়ে ওঠে ১৮৯৭ সালে আলজেরিয়ায়, ১৯০৬ সালে মিসরে, পরের বছর তিউনিসিয়ায় এবং ১৯০৮ সালে ফিলিস্তিনে। ধীরে ধীরে এই তল্লাট জুড়ে চলচ্চিত্রের প্রসার বাড়ে। অবশ্য কোনো কোনো দেশ এই মাধ্যমকে দীর্ঘদিন গ্রহণ করেনি, যেমন— ষাট বা সত্তরের দশকের আগ পর্যন্ত সৌদি আরবে দেখানো হয়নি সিনেমা। আবার কোনো কোনো দেশে ফিল্ম নির্মাণের ওপর ছিল সরকারি কড়াকড়ি। আরববিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিকাশ ঘটে মিসরে; এরই মধ্যে আড়াই সহস্রাধিক ফিচার ফিল্ম সেখানে নির্মিত হয়েছে। অবশ্য বহুকাল ধরেই হয় আরব দেশগুলোতে বিদেশি ফিল্মমেকারদের মুভির শুটিং কিংবা আরব লোকদের সহায়তায় চলচ্চিত্র বানানোর চল ছিল। স্থানীয়দের বানানো ফিল্মগুলোর নিয়মিত আবির্ভাব ঘটতে শুরু করে বিশের দশকের শেষভাগে; সিরিয়ান ‘দ্য ইনোসেন্ট অ্যাকিউজড’ ও মিসরীয় ‘লায়লা’র মতো ছায়াছবির মাধ্যমে। রাষ্ট্রের স্বাধীনতাপ্রাপ্তিও স্থানীয় ফিল্মমেকিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতার পর বেশ কিছু আরব দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়।
আত্মপরিচয় অনুসন্ধান
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা লোকগাথা এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের প্রভাব আরব সিনেমার আত্মপরিচয় গড়ার নেপথ্যে সচেতন ও অবচেতনে ভূমিকা রেখেছে। যাত্রা শুরুর প্রথম পর্যায়েই দুটি আলাদা ধারার প্রবাহ ঘটেছে তাতে। প্রথমটি মিসরে, যেটি মূর্ত করেছিলেন তালাত হার্ব, যিনি সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন মিসরের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায় উদ্যোক্তা। সিনেমার যে অর্থনৈতিক ও শিল্পজাত সম্ভাবনা রয়েছে, তা বুঝতে পেরে ফিল্ম স্টুডিও গড়ে তুলেছিলেন। আর সিনেমাকর্মে অর্থলগ্নির জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাণিজ্যিক ব্যাংক, ১৯২০ সালে। ব্যাংক মিসর নামে যেটি এখনো মিসরের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তালাতের সেই সিনেমা উদ্যোগ মূলত হলিউডের জন্মপ্রক্রিয়া মনে করিয়ে দেয়। ফলে আরব দুনিয়ায় তার অর্থায়নে ব্যাপক রোমান্টিক, রোমাঞ্চকর এবং সর্বোপরি মিউজিক্যাল কমেডি ধারার মুভিং পিকচার নির্মাণ বাড়তে থাকে। বলা বাহুল্য, সেখানে বাস্তবতার ক্লেদ থেকে জীবনকে একটু নিস্তার দিতে অলীক কল্পনার রাজ্যের ছিল অতিরঞ্জিত উপস্থাপনা; যেমনটা সচরাচর তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোতে দেখা মেলে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ধারা গড়ে ওঠার নেপথ্যে অবিসংবাদিত ভূমিকা রেখেছিলেন তিউনিসীয় ফিল্মমেকার এবং আরব সিনেমার অন্যতম প্রাথমিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত আলবার্ট সামামা সিকলি। বিশেষত শর্টফিল্ম ‘জোহরা’ (১৯২২) ও ফিচার ফিল্ম ‘দ্য গার্ল অব কার্থেজ’-এ (১৯২৪) বাস্তবতাকে তিনি অনেকটাই ডকুমেন্টারিতুল্য বাস্তব রূপে হাজির করেছিলেন। আর আরব সিনেমাকে আপাত নাবালকত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে আধুনিক পর্যায়ে উন্নীত করেছেন মিসরীয় ফিল্মমেকার ইউসেফ শাহিন, যাকে তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আরব চলচ্চিত্রকার গণ্য করা হয়। সুসজ্জিত ও পরিপাট্য চরিত্রগুলোর পর্দা সরিয়ে ‘অধিকার বুঝে নেওয়ার প্রবল দাবিতে’ তার চলচ্চিত্রগুলোর কেন্দ্রস্থলে জায়গা করে নেয় চাষাভূষা, হকার, শহরের ছিন্নমূল মানুষ। এর প্রবল সূচনা ১৯৬৯ সালের ‘দ্য ল্যান্ড’-এর মাধ্যমে। বিদেশি প্রভু বা ঔপনিবেশিক শাসক ও তাদের দোসরদের উন্নয়নের মুখোশে কৃষিজমি তথা নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় লোপাটের চক্রান্তের বিরুদ্ধে একদল কৃষকের প্রতিরোধযুদ্ধ এই চলচ্চিত্রের মূল প্রেক্ষাপট। মাস্টার ফিল্মমেকার হিসেবে শাহিনের খ্যাতি অবশ্য আগেই খোদাই হয়ে গিয়েছিল, ১৯৫৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কায়রো স্টেশন’-এর মাধ্যমে। ইতালিয়ান নিওরিয়ালিজমের প্রচ্ছন্ন প্রেরণার ছায়ামাখা সেই সৃষ্টির পর ‘দ্য ল্যান্ড’-এর মাধ্যমে তিনি নিজস্বতার পরিচয় পোক্ত করতে পেরেছিলেন। সাহিত্যে নোবেলজয়ী প্রথম আরব সাহিত্যিক নাগিব মাহফুজের সঙ্গে তার কর্মসম্পর্কও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যান্য সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে শাহিন সিনেমা বানালেও নাগিবের কোনো রচনাকে সরাসরি পর্দায় রূপান্তর করেননি; বরং খ্যাতিমান এই কথাশিল্পীর প্রতিভাকে ব্যবহার করেছিলেন চিত্রনাট্য রচনাতে।
আরব সিনেমাকে আপাত নাবালকত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে আধুনিক পর্যায়ে উন্নীত করেছেন মিসরীয় ফিল্মমেকার ইউসেফ শাহিন
‘দ্য ল্যান্ড’-এর মাধ্যমে আরব সিনেমা যখন নতুন ও নিজস্ব পথ খুঁজে পায়, সেটির ব্যাপ্তি আরও এগিয়ে দেন আরও কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ চলচ্চিত্রযোদ্ধা। সিরিয়ান ফিল্ম ‘দ্য ডিউপস’-এ (১৯৭৩) ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা এঁকেছেন মিসরীয় নির্মাতা তৌফিক সালেহ; ‘দ্য আফিম অ্যান্ড দ্য স্টিক’-এ (১৯৭১) আলজেরিয়ান নির্মাতা আহমেদ রাশেদি এবং ‘ক্রনিকল অব দ্য ইয়ারস অব ফায়ার’ (১৯৭৫)-এ তারই স্বদেশি মোহাম্মদ লাখদার-হামিনা দেখিয়েছেন উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের মাহাত্ম্যের আখ্যান; ‘আ থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান হ্যান্ড’ (১৯৭৩) ও ‘আমোক’ (১৯৮৩)-এর মাধ্যমে স্থানীয় কারিগরদের প্রতি উদারতা ও সংবেদনশীলতা এবং শোষণের বিরুদ্ধে নিজের লড়াই প্রকাশ করেছেন মরোক্কান ফিল্মমেকার সুহেইল বেন-বারকা; ‘দ্য ট্রেস’ (১৯৮৮)-এ নেজিয়া বেন মাবরুক, ‘ক্রসিং ওভার’ (১৯৮২)-এ মাহমুদ বেন মাহমুদ, ‘সেইনেন’ (১৯৭৩)-এ আবদেললতিফ বেন আম্মার এবং ‘ম্যান অব অ্যাশেজ’ (১৯৮৬) ও ‘গোল্ডেন ক্লগস’ (১৯৮৮)-এ নুরি বাউজিদ— প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতার প্রতি দুর্নিবার সংবেদনশীল মনোভাবের ঘটিয়েছেন উদ্ভাসন এই তিউনিসীয় চলচ্চিত্রকাররা।
ইসরায়েলের সঙ্গে দফায় দফায় যুদ্ধ, যুদ্ধের প্রভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় সামরিক শক্তির উত্থান, বিভিন্ন মতভেদ, ধর্মীয় সংঘাত ইত্যাদি কারণে আরব দুনিয়ায় নানাবিধ জটিলতা ছড়িয়ে থাকায় ফিল্মমেকাররা হরদমই ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন। এর প্রভাবে এমন একদল নতুন চলচ্চিত্রকারের আবির্ভাব ঘটে, যারা এক মানুষের সঙ্গে অপরের সম্পর্ক এবং নাগরিক ও রাষ্ট্রক্ষমতার মাঝখানে জায়গা করে নেওয়া সামাজিক বিভাজন ও জটিলতাগুলোর প্রকাশ ঘটাতে থাকেন। যৌনতা, ভিন্ন ধর্মের জীবনসঙ্গী বাছাই, সামাজিক বিধিনিষেধ প্রভৃতি ট্যাবুগুলো স্পর্শ করারও সাহস দেখান তাদের কেউ কেউ। বলে রাখা ভালো, এই পথের সন্ধানও দিয়ে গেছেন ইউসেফ শাহিন; বিশেষত তার আধা-আত্মজৈবনিক আলেক্সান্দ্রিয়া চতুষ্টয়ের মাধ্যমে, যে তালিকায় রয়েছে ‘আলেক্সান্দ্রিয়া... হোয়াই?’ (১৯৭৯), ‘আ ইজিপসিয়ান স্টোরি’ (১৯৮২), ‘আলেক্সান্দ্রিয়া: অ্যাগেইন অ্যান্ড ফরএভার’ (১৯৯০), ‘আলেক্সান্দ্রিয়া... নিউইয়র্ক’ (২০০৪)।
আরব বসন্তের প্রভাব
২০১০ সালের শেষদিকে আরব দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে, যা আরব বসন্ত নামে পরিচিত। এর সবচেয়ে প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়েছিল মিসরে। এ সময়ে সে দেশের ফিল্মমেকার তামের ইজ্জত, আহমাদ আবদাল্লা, আয়তেন আমিন ও আমর সালামা যৌথভাবে নির্মাণ করেন অ্যান্থলজিক্যাল ফিল্ম ‘তাহরির ২০১১: দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য পলিটিশিয়ান’ (২০১১)। তিউনিসিয়ার প্রেক্ষাপটে সে দেশের মুরাদ বেন শেখের ‘নো মোর ফিয়ার’ (২০১১), সামি তলিলির ‘কার্সড বি দ্য ফসফেট’ (২০১২), হিন্দ বুজেমার ‘ইট ওয়াজ বেটার টুমরো’ (২০১২) প্রভৃতিও আলোড়ন তোলে। এ দুই দেশের বাইরে আরববিশ্বের আরও বেশ কিছু ভূখণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছিল আরব বসন্ত। এ নিয়ে কাজও হয়েছে প্রচুর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইয়েমেনের ফিল্মমেকার সারা ইশাকের ‘দ্য মালবেরি হাউস’ (২০১৩), মরক্কান নাদির বুমুশের ‘মাই মাখজেন অ্যান্ড মি’ (২০১২), একই দেশের হিশাম লাসরির ‘দে আর দ্য ডগস’ (২০১৩) প্রভৃতি। এসব ডকুমেন্টারির পাশাপাশি ফিচার বা ফিকশন ফিল্মেও সেই বসন্ত বাতাসের প্রভাব প্রবল। মিসরের উত্তাল দিনগুলোতে বিক্ষোভ ও দমন-পীড়ন এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার মাঝেই শুটিং করে ইউসরি নাসরাল্লাহ নির্মাণ করেন ‘আফটার দ্য ব্যাটল’ (২০১২)। অন্যদিকে আলজেরিয়ান প্রসিদ্ধ ফিল্মমেকার মেরজাক আলায়ুশ বানিয়েছেন ‘নরমাল!’ (২০১১)। সেই পরম বিক্ষোভের ঢেউয়ে বেশ কিছু আরব দেশের তৎকালীন শাসকরা ক্ষমতাচ্যুত হলেও এর প্রতিশ্রুত সুফল মেলেনি। বরং নব্য উগ্রবাদের উত্থান গণমানুষের জীবনে বসন্ত বাতাসের বদলে বিভীষিকা ডেকে এনেছে, যার সাক্ষ্য মেলে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমাগুলোতে। উদাহরণস্বরূপ, মিসরীয় আহমাদ আবদাল্লার ‘র্যাগস অ্যান্ড টেটারস’-এ আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে কারামুক্ত হওয়া এক ব্যক্তি নিজেকে খুঁজে পায় এক নিষ্ঠুর ও কলহপ্রিয় সমাজে, যে দুনিয়াকে তার কাছে নরকতুল্য ঠেকে; আবার তিউনিসীয় কাউথার বেন হানিয়ার ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য ডগস’-এ (২০১৭) পুলিশের ধর্ষণের শিকার এক তরুণী চরম লড়াই চালায় প্রবল আধিপত্য বজায় রাখা নির্মম পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে।
বাছাই সিনেমা
কায়রো স্টেশন: আরব সিনেমার প্রসঙ্গ এলেই এই ফিল্মের নিরানন্দকর দৃশ্যশৈলী মনে পড়ে যায় অনেক সিনেমাবোদ্ধার। মিসরের সবচেয়ে বড় রেলস্টেশনে ছিন্নমূল, খোঁড়া, ক্ষীণ বুদ্ধির যুবক কিনায়ির কোনোমতে বেঁচে থাকার প্রয়াস, বাস্তবতার রূঢ়তা থেকে রেহাই পেতে রূপসী অবৈধ হকার হানুমাকে ঘিরে স্বপ্নের জাল বোনা এবং স্বপ্নভঙ্গের প্রতিশোধস্পৃহায় নৃশংস অপরাধীতে পরিণত হওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ, আর শেষ পর্যন্ত অসহায় আত্মসমর্পণ ঘিরে এর কাহিনি। কিন্তু সেই সমর্পণ কার প্রতি? পাগলাগারদ থেকে আসা লোকগুলোর কাছে? রাষ্ট্রব্যবস্থার নিকট, নাকি স্বয়ং জীবনের পানে? এতটুকুও আলো না থাকা বাস্তবতার কারাবন্দি কিনায়ির প্রতি আক্ষরিক অর্থে হয়তো কোনো সমবেদনা জেগে ওঠার কথা নয়। তবু দুনিয়া জুড়ে নানা পরিমাপে মানুষ যে জীবনবিধান গড়ে রেখেছে, অবচেতনে ও সচেতনে যে শৃঙ্খলা লালন করে ব্যক্তিমানুষ, দর্শক হিসেবে তার মনে ক্লেদের নিষ্করুণ প্রবাহ ছড়িয়ে দেয় এই চলচ্চিত্র।
দ্য নাইট অব কাউন্টিং দ্য ইয়ারস: ১৯৬০-এর দশকে দুনিয়া জুড়ে উপনিবেশমুক্তকরণের মাধ্যমে প্রাণীত হয়ে শৈল্পিক সিনেমার ক্রমবিকাশ ঘটেছিল। ফলে আখ্যান ও দৃশ্যগত উপস্থাপনের স্বদেশজাত গঠন বিন্যাসের প্রতি ব্যাপক কৌতূহল জাগ্রত হয়। পরিণামে দেখা মিলেছে সব ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্রিক নিরীক্ষার, যার দারুণ উদাহরণ ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মিসরীয় ফিল্মমেকার সাদি আবদেল সালামের এই ফিল্ম।
যুদ্ধের ধ্বংসলীলাকেও তিনি একটু মৃদু চাদরে ঢেকে দেখতে ও দেখাতে চান
ওয়েস্ট বৈরুত: নৈরাশ্যের কাছে আত্মসমর্পণে রাজি না হওয়ার বৈপ্লবিক কাহিনিচিত্র। ১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া এই ফিল্মে লেবানিজ ফিল্মমেকার জিয়াদ দুয়েইরি খোদাই করেছেন নিজস্ব ফিল্মি স্বর। পরিবর্তন অসাধ্য বাস্তবতার দেয়ালে বৈরুতের ইমারতের ইটগুলোতে একসুতায় গেঁথে নিয়ে একটি শহরের ধ্বংসচিত্রের ওপর গড়ে তুলেছেন এমন ফিল্ম, যেটি একটি সুতীব্র অথচ অনেকটাই স্পর্শকাতর স্মৃতির ভেতর যুদ্ধের দুঃস্বপ্নকে আকার দিয়েছে।
ডিভাইন ইন্টারভেনশন: ইসরায়েলি আগ্রাসনে প্রতিমুহূর্তে নিজ জন্মভূমিকে জর্জরিত হতে দেখলেও ফিলিস্তিনি ফিল্মমেকার এলিয়া সুলেইমানের প্রকাশভঙ্গি ভীষণ কোমল। যুদ্ধের ধ্বংসলীলাকেও তিনি একটু মৃদু চাদরে ঢেকে দেখতে ও দেখাতে চান। ফলে একটি বৈপ্লবিক সিনেমা কেমন হতে এবং কীভাবে এগিয়ে যেতে পারে, দর্শকের এমন আন্দাজকে ভুলিয়ে দিয়ে গভীর জীবনবোধের বিস্তার ঘটেছে ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ডিভাইন ইন্টারভেনশন’-এ। তবে সুলেইমানের অপরাপর ফিল্মের সঙ্গে এর বড় পার্থক্য, এখানে তিনি সংঘাতের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। অবশ্য সেটি কল্পনার পর্দায় ঢেকে, অনেকটাই ভিডিও গেমসের ভঙ্গিমায়।
আরব সিনেমার ভবিষ্যৎ ও একটি মর্মন্তুদ আকুতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুনিয়া জুড়ে আরব সিনেমার পুনরুত্থান ঘটছে। দাপুটে কাহিনিবিন্যাস এবং নারীপ্রধান আখ্যানের জয়গান তাতে। গুরুত্বপূর্ণ ফেস্টিভ্যালগুলোতেও আলো ছড়াচ্ছেন এই তল্লাটের ফিল্মমেকাররা। এর মধ্যে একটি সিনেমা সারা দুনিয়াকে শ্বাসরুদ্ধকর কাঁপুনি দিয়ে গেছে। ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’। ডকুড্রামা। কাউথার বেন হানিয়ার নির্মাণ। মুক্তি ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫। ফিল্মটির অফিসিয়াল সিনোপসিস পড়লেই টের পাওয়া যাবে এর ধারণকৃত মর্মযাতনা: “২৯ জানুয়ারি ২০২৪। (ফিলিস্তিনের) রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে টেলিফোনে একটি ইমার্জেন্সি কল আসে। গাজায় (ইসরায়েলি সেনাদের) গুলিবর্ষণরত একটি গাড়িতে আটকা পড়ে গেছে ছয় বছর বয়সী এক (ফিলিস্তিনি) বালিকা; সাহায্যের আকুতি জানাচ্ছে সে। তাকে টেলিফোনে রেখেই উদ্ধারকারী অ্যাম্বুলেন্স পাওয়ার জন্য যারপরনাই চেষ্টা চালাতে থাকেন ওই স্বেচ্ছাসেবীরা। মেয়েটির নাম ‘ছিল’ হিন্দ রাজাব।” তাকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। চলমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের শিকার অগুনতি ফিলিস্তিনি শিশুর একজন হিসেবে সে কেবলই একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছিল! রেড ক্রিসেন্টকর্মীদের ধারণকৃত হিন্দ রাজাবের সত্যিকারের কণ্ঠস্বরের রেকর্ড এই ফিল্মে সরাসরি ব্যবহার করে ঘটনাকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মাধ্যমে পুনঃসৃষ্টি করেছেন নির্মাতা। এর ফলে ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’ এমন এক ফিল্মে পরিণত হয়েছে, যা কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে অসহনীয়; অথচ এড়ানোও অসম্ভব!
আলোচিত আরও চলচ্চিত্র
‘কিট ক্যাট’, দাউদ আবদেল সায়েদ, মিসর, ১৯৯১; ‘ক্যারামেল’, নাদিন লাবাকি, লেবানন, ২০০৭; ‘প্যারাডাইজ নাউ’, হানি আবু আসাদ, ফিলিস্তিন, ২০০৫; ‘দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ারস’, জিলো পন্তেকর্ভো, আলজেরিয়া, ১৯৬৬; ‘থিব’, নাজি আবু নাওয়ার, জর্ডান, ২০১৪; ‘গুডবাই জুলিয়া’, মোহামেদ কর্দোফানি, সুদান, ২০২৩; ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব দ্য সিটি’, তামের এল সাইদ, মিসর, ২০১৬; ‘ইউ উইল ডাই অ্যাট টোয়েন্টি’, আমজাদ আবু আলালা, সুদান, ২০১৯।





