সমালোচকের চোখ : গ্রেগরি’স গার্ল
কৈশোরক স্বপ্ন ও যাতনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কয়েক দিন আগে পত্রিকায় এমন একটি ছোট খবর প্রকাশ পেয়েছিল, যেটি প্রথম পাতার প্রধান সংবাদ হওয়ার যোগ্য। একটি জরিপের ভিত্তিতে ওই খবরে বলা হয়, গড়পড়তা চেহারার তুলনায় সুদর্শন পুরুষদের ব্যবসায় সাফল্য, উপার্জন এবং আকাঙ্ক্ষিত জীবনসঙ্গী পাওয়ার হার কম; তারা বিয়েও করেন অল্প বয়সে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সমাজবিজ্ঞানীদের অনুমান, সুদর্শন ছেলেরা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে ছিটকে যায়। পড়াশোনার চেয়ে আড্ডাবাজিতে সময় কাটায় বেশি। কলেজে উঠে পড়াশোনা শিকেয় তুলে নিজের রূপে নিজেই মোহিত হয়ে দিন পার করে। শারীরিক চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে অল্প বয়সে বিয়ে করার কারণে ক্যারিয়ার সচেতনদের চেয়ে সংসারে আগ্রহী নারীদেরই বেছে নেয়। তাই বলা চলে, ব্রণভরা অদ্ভুতদর্শন চেহারার যে ছেলে কেমিস্ট্রি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হয়েছে, বিদ্যালয়ের সবচেয়ে সুদর্শন ছেলের চেয়ে তার ভবিষ্যৎ ভালো।
সেই অদ্ভুতদর্শন ছেলেকে নিয়েই দারুণ, সরল এবং চমৎকার মজার ছোট্ট চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন স্কটিশ ফিল্মমেকার বিল ফরসাইথ, ‘েগ্রগরি’স গার্ল’ শিরোনামে। এর পটভূমি স্কটল্যান্ড। যেকোনো জায়গার তুলনায় যেখানকার কিশোর-কিশোরীরা বেশ শান্ত, মার্জিত ও সরল। কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রেগরি। লিকলিকে লম্বা কিশোর। আচমকাই বেশ লম্বা হয়ে গেছে সে। ফুটবল মাঠে নিজেকে সামলাতে ভীষণ আনাড়ি ও অপ্রস্তুত। দেখতে আদুরে সারস পাখির মতো। ফুটবল দলে সে জায়গা হারিয়ে ফেলে নিজের চেয়ে অনেক গতিশীল ও চটপটে এক শিক্ষার্থীর কাছে। ঘটনাক্রমে সেই শিক্ষার্থী এক কিশোরী; নাম ডরোথি। জায়গা হারালেও ওই মেয়ের প্রেমে পড়ে যায় গ্রেগরি। এমন অনুভূতি তার জীবনে আগে আসেনি। এই প্রেম তার কাছে হয়ে দাঁড়ায় শারীরিক অসুস্থতার মতো। গ্রেগরির প্রতি সহানুভূতি অনুভব করে ডরোথি ঠিকই; কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখে। কেননা, জীবন সম্পর্কে তার বোঝাপড়া গ্রেগরির চেয়ে অনেক আগানো।
রজার ইবার্ট। জন্ম ১৮ জুন ১৯৪২; মৃত্যু ৪ এপ্রিল ২০১৩। পুলিৎজারজয়ী আমেরিকান চলচ্চিত্র সমালোচক, ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক। এই রিভিউ ১ জানুয়ারি ১৯৮১-তে প্রকাশিত; রজারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে নিয়ে অনূদিত
১৬ বছর বয়সে সবাইকে নিয়ে সুখী হওয়া কত অসম্ভব, এই নিয়ে অশেষ জল্পনা-কল্পনায় ছেলেমেয়েরা অলস সময় কাটায়— গ্লাসগোর এমন এক মনোরম শহরতলিতে জায়গা করে নিয়েছে চলচ্চিত্রটির বেশিরভাগ অংশ। প্রেমসংক্রান্ত পরামর্শের জন্য সেখানে গ্রেগরি তার ছোট বোনের কাছে যায়, ছেলেদের চেয়ে আইসক্রিমের প্রতিই আগ্রহ যার বেশি। বয়স মাত্র দশ বছর হলেও শারীরিকভাবে দেখতে ১৩ বছরের কিশোরীর মতো— এক ছেলের কাছ থেকে এমন প্রশংসা পেলেও বোনটি আসলে ছেলেদের নিয়ে তেমন ভাবেই না। এরই মধ্যে কখনো প্রেমের স্বাদ না পাওয়া ১৫ বছর বয়সী নিজের সবচেয়ে ভালো বন্ধুকে সান্ত্বনাও দেয় গ্রেগরি।
কামিং-অব-এজ রোমান্টিক কমেডি ধারার ‘গ্রেগরি’স গার্ল’ মনে করিয়ে দেয়, বড় হতে হতে কৈশোর সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই। যেমন কোনো কিশোরকে দোষত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেওয়ার মানে নেই; কেননা সে নিজেই নিজের সম্ভাব্য প্রতিটি খুঁতের খুঁটিনাটিসহ যন্ত্রণার ব্যাপারেও অবগত। আরও মনে করিয়ে দেয়, বয়স কাছাকাছি হলেও কৈশোরে প্রেমের তীব্রতায় ছেলেরা সাধারণত অসহায় হয়ে পড়ে, যেখানে মেয়েরা আয়ত্ত করে নেয় বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। ১৬ বছর বয়সী কোনো ছেলেমেয়ে কখনোই সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের প্রেমে পড়ে না, এই অলিখিত শাশ্বত নিয়মের বার্তা দেয় সিনেমাটি।
চলচ্চিত্রটিতে এ ধরনের দর্শনকে মৃদু ও মার্জিত রসিকতার সঙ্গে দেখানো হয়েছে। এ পথচলায় সারসরূপী গ্রেগরি ছুটতে থাকে একটি মরীচিকার পেছনে, যার শেষে অপেক্ষায় একটি রাজহাঁস। বেঁচে থাকা, কৈশোরের অনুভূতি এবং আবেগের দুর্বলতা নিয়ে ফুটবল দলে স্বপ্নের প্রেয়সীর কাছে জায়গা হারানো কিশোরকে ঘিরে ‘গ্রেগরি’স গার্ল’ এত গভীর জ্ঞান লুকিয়ে রেখেছে, যা ওই বয়সীদের জন্য দেখা বেশ কষ্টদায়কও হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ যখন আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সম্পূর্ণ হতাশাজনক একতরফা প্রেমের যন্ত্রণায় ভোগে, শুধু সে এমন কষ্ট পাচ্ছে না বা মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন না; বরং এটি চিরন্তন এক যাত্রা, সেই বার্তা এই চলচ্চিত্রে দারুণভাবে রয়েছে। যদিও এমনটা জানা হয়তো কোনো সান্ত্বনাই এনে দেবে না মনে!





