সীমানা পেরিয়ে তারা

(বাঁ থেকে) জয়া আহসান চঞ্চল চৌধুরী, তাসনিয়া ফারিণ আরিফিন শুভ, (নিচে) সঞ্জয় দেব
ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখা— কোনোটিই থামাতে পারেনি স্বপ্নযাত্রা। অভিনয়, গানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিভারা বিশ্বমঞ্চে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এমন কয়েকজনকে নিয়ে লিখেছেন মীর রাকিব হাসান
ওপার বাংলায় নায়িকারা
ভারতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিতভাবে কাজ করছেন অভিনেত্রী জয়া আহসান। পশ্চিমবঙ্গে একের পর এক সিনেমায় সুঅভিনয়ের মাধ্যমে আলাদা অবস্থান গড়ে নিয়েছেন তিনি। শুরুটা হয়েছিল ‘আবর্ত’ দিয়ে, ২০১৩ সালে। এরপর একে একে ‘একটি বাঙালি ভূতের গপ্পো’, ‘রাজকাহিনী’, ‘ঈগলের চোখ’, ‘ভালোবাসার শহর’, ‘বিসর্জন’, ‘আমি জয় চ্যাটার্জি’, ‘এক যে ছিল রাজা’, ‘ক্রিসক্রস’ ‘বিজয়া’, ‘কণ্ঠ’, ‘রবিবার’, ‘বিনিসুতোয়’, ‘ঝরা পালক’, ‘অর্ধাঙ্গিনী’, ‘দশম অবতার’, ‘ভূতপরী’, ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, ‘ওসিডি’ এবং সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’র মতো আলোচিত সিনেমায় অভিনয় করেছেন দুই বাংলার জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলায় চারবার পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ওপার বাংলায় জয়ার ‘কালান্তর’ সিনেমাটি মুক্তির অপেক্ষায় আছে।
আজমেরী হক বাঁধন পশ্চিমবঙ্গে ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ সিনেমায় অভিনয় করেন। তাসনিয়া ফারিণ প্রথম সিনেমা ‘আরও এক পৃথিবী’র মাধ্যমে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডসে সেরা নবীন অভিনেত্রী বিভাগে পুরস্কার জিতেছেন। নুসরাত ফারিয়া ‘ভয়’, ‘বিবাহ অভিযান’সহ ওপার বাংলার কয়েকটি সিনেমায় গ্ল্যামারের ঝলক দেখিয়েছেন। গত বছর কাজী নওশাবা আহমেদ ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ সিনেমায় প্রশংসা কুড়ান।
অভিনেতাদের গল্প
বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন অভিনেতা ওপার বাংলায় দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এ তালিকায় আছেন চঞ্চল চৌধুরী ও মোশাররফ করিম। তারা নিজেদের অভিনয়গুণে দুই বাংলার দর্শকের আস্থা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে ‘পদাতিক’ দিয়ে ২০২৪ সালে টালিউডে অভিষেক হয় চঞ্চল চৌধুরীর। প্রথম সিনেমা দিয়েই ওপার বাংলার নির্মাতাদের কাছে ভরসা হয়ে উঠেছেন তিনি। মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘শেকড়’ ও ‘আজাদি’ নামের দুই সিনেমা। মোশাররফ করিম ‘ডিকশনারি’ ও ‘হুব্বা’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন।
বলিউডে তারা
বলিউডে বাংলাদেশি তারকাদের উপস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত হয়েছে। ২৫ বছর আগে ফেরদৌস ‘মিট্টি’ নামের হিন্দি সিনেমায় কাজ করেন। সম্প্রতি বিশাল ভরদ্বাজের ‘খুফিয়া’ সিনেমায় অভিনয় করে আলোচনায় আসেন আজমেরী হক বাঁধন। অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর ‘কড়ক সিং’-এর মাধ্যমে হিন্দি ভাষার কাজে প্রথমবার নিজেকে তুলে ধরেন জয়া আহসান।
কিছুদিন আগে দারুণ আলোচিত হয়েছেন আরিফিন শুভ। সনি লিভের ওয়েব সিরিজ ‘জ্যাজ সিটি’তে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বলিউডের মূলধারার কনটেন্টে বাংলাদেশের প্রথম অভিনেতা হিসেবে নতুন দুয়ার খুলেছেন তিনি। সিরিজটি মুক্তির পর ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তার অভিনয়ের প্রশংসা করেছে।
সুরের মূর্ছনা
বলিউডে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ধরা যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লাকে। সত্তর দশকে হিন্দি সিনেমায় তার গাওয়া গানগুলো আজও শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে। যেমন ‘ও মেরা বাবু চেইল ছেবিলা’, ‘দো দিওয়ানে শেহের মে’।
বলিউডে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের আরেক ঝড় তোলা প্রতিনিধি নগরবাউল জেমস। ‘গ্যাংস্টার’ (২০০৫) সিনেমায় তার গাওয়া ‘ভিগি ভিগি’ গোটা দুনিয়ায় সাড়া ফেলেছিল। এ ছাড়া ‘ও লামহে’ (২০০৬) সিনেমার ‘চল চলে’, ‘লাইফ ইন অ্যা মেট্রো’তে (২০০৭) ব্যবহৃত ‘আলবিদা’ ও ‘রিশতে’ গানগুলোও তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে।
একসময় প্রয়াত এন্ড্রু কিশোর বলিউডে একটি গান করেছিলেন।
এদিকে সম্প্রতি বিশ্বসংগীতের মঞ্চেও বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান সংগীতশিল্পী সঞ্জয় দেব। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুধু সংগীত নয়, নিজের পোশাকেও তিনি তুলে ধরেন বাংলাদেশের পরিচয়।
হলিউডে প্রথম বাংলাদেশি
বাংলাদেশ থেকে হলিউডে অভিনয়ের পথ খুলে দিয়েছিলেন নায়লা আজাদ নূপুর। আশির দশকের এই অভিনেত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হলিউডে অভিনয় শুরু করেন। ‘স্টর্ম ইন দ্য আফটারনুন’ (১৯৯৮) দিয়ে তার হলিউড যাত্রা শুরু। পরে হ্যারিসন ফোর্ড অভিনীত ‘ক্রসিং ওভার’ (২০০৯) সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায় তাকে।
‘বার্বি’তে প্রবাসী বাংলাদেশি
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ অভিনেতা রমজান মিয়া ধীরে ধীরে হলিউড ও ব্রিটিশ বিনোদন অঙ্গনে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। বিশ্বকাঁপানো সিনেমা ‘বার্বি’তে দেখা গেছে তাকে। এ ছাড়া ‘এনোলা হোমস ২’, ‘এভরিবডিস টকিং অ্যাবাউট জেমি’সহ হলিউডের একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ডিজনির ‘আলাদিন’ এবং স্যার এলটন জনের বায়োপিক ‘রকেটম্যান’-এ নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন এই তরুণ। এইচবিও’র জনপ্রিয় সিরিজ ‘হাউজ অব দ্য ড্রাগন’-এ তার উপস্থিতি দর্শকের নজর কাড়ে।
শ্রমিক থেকে অভিনেতা
১৯৯৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে পাড়ি জমান মাহবুব আলম। পরে অভিনয়ে যুক্ত হন। তিনি ‘হোয়্যার ইজ রনি’ ও ‘বান্ধবী’র মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান। চলচ্চিত্র ছাড়াও বেশ কয়েকটি কোরিয়ান টিভি শো এবং বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন তিনি। খুলনার ছেলে সজল মাহমুদকে ১৫ বছর বয়সে কোরিয়ান এক পরিবার দত্তক নেয়। কোরিয়ার বিনোদন জগতে তার নতুন নাম সজল কিম। ‘রুড মিস ইয়াং-ই’, ‘স্পেশাল লেবার ইন্সপেক্টর’ এবং ‘ওয়েলকাম টু সামডাল-রি’র মতো জনপ্রিয় কে-ড্রামায় দেখা গেছে তাকে।
অস্ট্রেলিয়ান শোবিজে
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অর্ক ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। সিডনিতে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী অভিনয়ের পাশাপাশি নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা হিসেবে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ায় মঞ্চনাটকের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান গড়েন তিনি। ২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বহুল প্রশংসিত চলচ্চিত্র ‘হিয়ার আউট ওয়েস্ট’-এ অভিনয় ও সহ-চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসেন অর্ক। পশ্চিম সিডনির সাংস্কৃতিক জীবন নিয়ে নির্মিত এই সিনেমায় তার অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। এ ছাড়া জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘দ্য নিউজ রিডার’, ‘রোজ হ্যাভেন’, ‘সেইফ হোম’, ‘অফস্প্রিং’ এবং চলচ্চিত্র ‘দ্য র্যাপিড আই মুভমেন্ট’-এ অভিনয় করেছেন তিনি।
হলিউডে ক্যামেরার পেছনে
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রথম অস্কার জিতেছেন নাফিস বিন জাফর। ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান: অ্যাট ওয়ার্ল্ডস এন্ড’ সিনেমার সমুদ্রের দৃশ্য থেকে শুরু করে ‘ট্রান্সফরমার্স’, ‘ট্রন: লিগ্যাসি’, ‘কুংফু পান্ডা ২’, ‘মাদাগাস্কার থ্রি’, ‘শ্রেক ফরএভার আফটার’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তার কাজ রয়েছে। ২০০৮ সালে প্রথম এবং ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বার কারিগরি শাখার অস্কার পান তিনি।
কানাডা প্রবাসী ওয়াহিদ ইবনে রেজা এক বহুমাত্রিক সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার’, ‘গেম অব থ্রোনস’, ‘ফিউরিয়াস সেভেন’সহ বহু আন্তর্জাতিক প্রযোজনার ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসে কাজ করেছেন তিনি। সম্প্রতি তার নির্মিত অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘আফটার আস’ জাপানে পুরস্কার জিতেছে।
কুমিল্লার কামরুল হাসান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ট্রেলার স্টুডিও ওয়াইল্ড কার্ড ক্রিয়েটিভ গ্রুপে কর্মরত। ‘দ্য ব্যাটম্যান’, ‘ব্ল্যাক অ্যাডাম’, ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’সহ বহু আলোচিত চলচ্চিত্রের ট্রেলারে তার কাজ রয়েছে।




