আগামীর সময়

ক্লাসরুম কি ফিরছে স্মার্টফোনের পর্দায়?

ক্লাসরুম কি ফিরছে স্মার্টফোনের পর্দায়?

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়

যুদ্ধের ছায়া পড়েছে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে। অপ্রতুল যোগানে ফিলিং স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি। জ্বালানি না থাকায় থেমে আছে চাকা। শিক্ষার্থীরাও যেতে পারছে না স্কুলে। রাজধানীর অভিজাত পাড়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান স্বাভাবিক রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ হলো হাঁড়ির হাল। এ হাল ফেরাতে সরকার চায় শিক্ষা দরদি হাতে পরিস্থিতির রাশ টেনে ধরতে। বিবেচনায় অনলাইন ও অফলাইন সমন্বয়ে ‘হাইব্রিড’ (সশরীর ও অনলাইন সমন্বিত) পদ্ধতিতে পঠনপাঠন।

রমজান, ঈদুল ফিতর এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার নির্দেশিত বিশেষ ছুটি মিলিয়ে ৪০ দিনের টানা দীর্ঘ বিরতি শেষে গতকাল রোববার খুলেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে প্রথম দিনেই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল প্রত্যাশার চেয়ে বহু কম।

রাজধানী ঢাকা ও জেলা ও উপজেলাসহ এদিন দেশজুড়েই দেখা গেছে একই চিত্র। শ্রেণিকক্ষগুলোতে ফেরেনি চেনা চাঞ্চল্য। রাজধানীর নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সশরীরে ক্লাস শুরু হলেও প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে বড় ধরনের ভাটা পড়ে। বিশেষ করে অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত ধানমন্ডি, গুলশান ও উত্তরার স্কুলগুলোতে, যেখানে ৬০-৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করে, সেখানকার চিত্র ছিল বেশ হতাশাজনক।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা খাতুন প্রথম দিনেই তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০-২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির তথ্য তুলে ধরলেন। তিনি বলেছেন, জ্বালানি সংকটে গাড়ি বের করতে না পেরে অনেক অভিভাবক আগেই স্কুল কর্তৃপক্ষকে ছুটির কথা জানিয়েছেন।

জ্বালানি সংকট ঘিরে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থী উপস্থিতিতে ভাটার শঙ্কার কথা জানান রাজধানীর আরও কয়েকটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা। তাদের ভাষ্য, সশরীরে ক্লাস শুরুর প্রস্তুতি নিলেও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

তিন স্তরের পরিকল্পনা সরকারের

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর পরিস্থিতি সামলাতে তিনটি বিকল্প পথ খোলা রেখেছে। সেগুলো হলো

এক. পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ক্লাস: সংকট আরও ঘনীভূত হলে করোনা মহামারির সময়ের মতো পুরোপুরি অনলাইনে পাঠদান।

দুই. হাইব্রিড পদ্ধতি: সশরীর ও অনলাইন—দুই মাধ্যমই খোলা রাখা, যাতে শিক্ষার্থী তার সুবিধামতো অংশ নিতে পারে।

তিন. সমন্বিত রুটিন: সপ্তাহে দু-তিন দিন সশরীরে ক্লাস এবং বাকি দিনগুলোতে অনলাইনে পাঠদান।

চলতি সপ্তাহটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখার কথা জানান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক বি এম হান্নান। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী সপ্তাহ থেকেই নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে—দিলেন এমন বার্তাও।

‘অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলাপ-আলোচনায় রয়েছে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। চলতি সপ্তাহ এভাবেই (স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পাঠদান) চলবে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী সপ্তাহে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে’, যোগ করেন তিনি।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ক্লাস হলে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ হ্রাস ও জ্বালানি সাশ্রয় দুটোই হবে বলে মনে করেন মাউশির এ শীর্ষ কর্তা।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং মাউশির তথ্য বলছে, শুধু ঢাকা মহানগরীতেই প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রয়েছে সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেগুলোতে অধ্যয়নরত প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর যাতায়াতে যে পরিমাণ জ্বালানি খরচ হয় এবং রাস্তায় যে যানজট তৈরি হয়, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৮ মার্চ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো বন্ধ রাখার অন্যতম কারণ ছিল এই জ্বালানি সাশ্রয়।

শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, স্বাভাবিক পাঠদান এড়িয়ে সময়োপযোগী বিকল্প পথে হাঁটাই হবে বিচক্ষণতার পরিচায়ক।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী জানালেন, গ্রামের চিত্র ভিন্ন হলেও রাজধানীর প্রেক্ষাপটে হাইব্রিড পদ্ধতিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ শিক্ষাবিদ বলেছেন, গ্রাম-গঞ্জে পায়ে হেঁটে, সাইকেল বা অটোরিকশায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে চলে গেলেও রাজধানীর বেশিরভাগ শিক্ষার্থী আসে ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা গণপরিবহনে চড়ে। অভিভাবক সঙ্গে করে নিয়ে আসেন, এমন সংখ্যা কিন্তু কম নয়।

‘তাই সার্বিক বিবেচনায় কমন একটি প্লার্টফর্ম করে ক্লাস নিতে হবে, যাতে যে যেভাবে পারবে সে যেন সেভাবে ক্লাসে যোগদান করার সুযোগ পায়। সেক্ষেত্রে হাইব্রিড পদ্ধতি (সশরীর ও অনলাইন) হতে পারে ভালো সিদ্ধান্ত’, যোগ করেন এই শিক্ষাবিদ।

একই ধরনের ভাবনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদেরও। তার মতে, বর্তমান সংকট বিবেচনায় অফলাইন ও অনলাইন দুটো পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। অনলাইনে যে শিখন ঘাটতি হয়, তা পূরণের জন্য বিকল্প হিসেবে সপ্তাহে অন্তত দুদিন সশরীরে ক্লাস রাখা প্রয়োজন। এই হাইব্রিড মডেল এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

এই হাইব্রিড মডেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইতিবাচক দিক হলো, অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয় পক্ষেরই রয়েছে। করোনাকালে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এমন পদ্ধতির চর্চা চলেছিল। এখন দেখার বিষয়, আগামীর ক্লাসরুম কি ব্ল্যাকবোর্ডেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি আবারও ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের স্ক্রিন হয়ে ওঠে পাঠদানের মূল কেন্দ্র।

    শেয়ার করুন: