২৭ শিক্ষার্থীর কলেজে শিক্ষক-কর্মচারী ২৮ জন

শিক্ষার্থী ২৭ জন। শিক্ষক-কর্মচারী ২৮ জন। অথচ বছরের পর বছর বেতন-ভাতা নিচ্ছেন তারা। মাত্র ২৭ জন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের বছরে ব্যয় হচ্ছে ১ কোটি ৫ লাখেরও বেশি। একই চিত্র পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও। ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে অংশ নিয়েছেন মাত্র ৩০ জন, আর ২০২৩ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ২৭ জন। এমন চিত্র রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আল হেরা কলেজে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। নতুন এমপিও নীতিমালায় নির্ধারিত ন্যূনতম শিক্ষার্থী ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা পূরণ করতে না পারায় রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের অভিযোগ তুলে কলেজটির এমপিও স্থগিত বা বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত দল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এমপিও নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় একটি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে ন্যূনতম শিক্ষার্থীর সংখ্যা হতে হবে ১৯০ জন। কিন্তু কলেজটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এর অর্ধেকও না। একইভাবে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর সংখ্যা হওয়ার কথা ৫০ জন। কিন্তু সেটিও পূরণ হয়নি। ফলে এমপিও নীতিমালার ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী কলেজটির এমপিও স্থগিত বা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিআইএর পরিদর্শক আফরুজ জামান, ড. সোহেল রানা ও অডিটর ফজলুল হক তদন্তকাজ পরিচালনা করেন। পরিদর্শনকালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ৯৫ জন শিক্ষার্থীর তথ্য উপস্থাপন করলেও সেদিন উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৭ জন। শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যাতেও পাওয়া গেছে গরমিল। ডিআইএর পরিদর্শনের দিন উপস্থিত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী ছিলেন ২৩ জন। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইএমআইএস পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ২৮ জন। অনুপস্থিত পাঁচজনের বিষয়ে এবং তাদের হাজিরা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে তদন্ত দলকে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি অধ্যক্ষ।
শিক্ষার্থী সংকটের পাশাপাশি নানা আর্থিক অনিয়ম ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। ২০২২ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন কেনাকাটা ও ব্যয়ের বিপরীতে সরকারি কোষাগারে ভ্যাট জমা না দিয়ে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এসব টাকা দ্রুত ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত বেতন-ফি ও কলেজের নিজস্ব খাতের আয় ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন না করে নগদে রাখা ও ব্যয় করার অভিযোগও রয়েছে। স্থায়ী শিক্ষকদের জন্য কোনো ভবিষ্য তহবিল (পিএফ) চালু করা হয়নি। কোনো বার্ষিক স্টক টেকিংও করা হয় না। কলেজে কেনাকাটার জন্য কোনো উপকমিটিও নেই। পাঠাগারে রয়েছে মাত্র ৫২০টি বই, যেখানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম ৫ হাজার বই থাকার কথা।
বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কাম্য শিক্ষার্থী না থাকা এবং বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনগণের করের টাকা এভাবে অপচয় হতে দেওয়া যায় না। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে খুব শিগগিরই আল-হেরা কলেজের এমপিও স্থগিতের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হবে।
জানতে চাইলে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অধ্যাপক এম এম শহিদুল ইসলাম বলেছেন, শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নির্ধারিত মানদণ্ডের অনেক নিচে থাকা সত্ত্বেও কলেজটি বছরের পর বছর বেতন-ভাতা নিচ্ছে, যা সরাসরি সরকারি অর্থের অপচয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, শিক্ষক-কর্মচারীর প্রয়োজনীয়তা এবং এমপিও সুবিধা অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাই জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী কাম্য শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা পূরণ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির এমপিও স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছেন— আগামীর সময়কে জানালেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক। বললেন, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় নির্ধারিত কাম্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা পূরণ না হলে বিধি অনুযায়ী যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেটিই গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আল-হেরা কলেজের অধ্যক্ষ আবু সালেহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, দীর্ঘদিন কলেজটিতে অধ্যক্ষ না থাকায় শিক্ষার্থী কমে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করে না। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে চেষ্টা করছি। এমপিও বন্ধের সুপারিশ করা হলে প্রকৃত ঘটনাসহ জবাব দেওয়ার কথা জানালেন আবু সালেহ।






