চ্যালেঞ্জে বদলে গেছে ৫৬ হাজার ফল
- ফেল থেকে পাস ৪,৫৮৫ নতুন জিপিএ ৫ পেল ৩,০৭৯

সংগৃহীত ছবি
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে বদলে গেছে হাজারো শিক্ষার্থীর ফল। গতকাল বৃহস্পতিবার পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের ফল প্রকাশের পর দেখা গেছে, ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ৫৬ হাজার ২৫১টি উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে। এতে গ্রেড বদলেছে ২৭ হাজার ৮৩৬ শিক্ষার্থীর। ফেল থেকে পাস করেছে ৪ হাজার ৫৮৫ এবং নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন। এত বিপুলসংখ্যক খাতায় ফল পরিবর্তন হওয়ায় প্রথমবার খাতা মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন— তাহলে কি প্রথম দফায় উত্তরপত্র ঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল!
এর আগে ১০ আগস্ট প্রকাশ করা হয়েছিল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে খাতা চ্যালেঞ্জ করেছে ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ শিক্ষার্থী। তারা ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৮টি স্ক্রিপ্ট বা খাতা চ্যালেঞ্জ করে।
শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যানরা বলছেন, খাতা মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের এতদিন আপত্তি ছিল, এবার এসএসসি খাতা চ্যালেঞ্জের ফলেও এর বড় প্রমাণ মিলেছে। প্রথমবারের মতো উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের বদলে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ যুক্ত হওয়ায় আবেদন ও ফল পরিবর্তন— দুটোই বেড়েছে।
পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নে চরম উদাসীনতা, অন্যকে দিয়ে মূল্যায়ন কিংবা তড়িঘড়ি করে খাতা দেখার অভ্যাসকে এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের সম্মানী কম হওয়া বড় কারণ বলে মনে করছেন তারা। পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি, পরীক্ষকদের দায়িত্বশীলতা এবং বোর্ডগুলোর তদারকি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ফেল থেকে পাস ৪,৫৮৫, নতুন জিপিএ ৫ পেল ৩,০৭৯: পুনর্মূল্যায়নের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পাস করা পরীক্ষার্থীর ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করেছিল। আবেদন করা ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৮টি খাতার মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ বা ৫৬ হাজার ২৫১টি খাতার নম্বর পরিবর্তন হয়েছে। আর ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের গ্রেড বদলেছে; ৪ হাজার ৫৮৫ জন ফেল থেকে পাস করেছে; ৩ হাজার ৭৯ জন নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পুনর্নিরীক্ষণ এবং পুনর্মূল্যায়নে কোথাও সঠিক উত্তর দেওয়ার পর নম্বর না পাওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে। কোথাও আবার উত্তরপত্রের ভেতরের নম্বর মূল পাতায় সঠিকভাবে ওঠেনি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিক উত্তরকে ভুল ধরে আংশিক নম্বর দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাতা মূল্যায়নের চাপ থাকলেও পরীক্ষকের দায়িত্ব পালনে অসতর্কতার সুযোগ নেই— এমন মনে করছেন বোর্ডসংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, কারণ একটি নম্বরের ভুলও একজন শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন করতে পারে এবং তার পরবর্তী শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সংশোধিত ফলের পর চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। মোট জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন।
এদিকে প্রথম দফায় উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো ধরনের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. ফারুক আহম্মেদ। তিনি বলেছেন, যেসব উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে, সেগুলো অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। এক্ষেত্রে শুধু প্রথম পরীক্ষকই নন, প্রধান পরীক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বও পর্যালোচনা করা হবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেছেন, পুনর্নিরীক্ষণে যেসব উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ১০ নম্বরের বেশি পরিবর্তন হওয়া খাতাগুলো বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হবে। নিয়ম অনুযায়ী ১০ নম্বর পর্যন্ত পরিবর্তন হলে তা স্বাভাবিক পরিবর্তনের আওতায় পড়ে। এক্ষেত্রে পরীক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান নেই। তবে কোনো উত্তরপত্রে ১০ নম্বরের বেশি নম্বর বাড়ানো বা কমানো হলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের মূল্যায়ন পদ্ধতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা বোর্ডেই বদল ২১ হাজার খাতার নম্বর: উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে ২১ হাজার ৬৯টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন হয়েছে। গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৯ শিক্ষার্থীর। ফেল থেকে পাস করেছে ৩৩৭ এবং নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯০৬ জন।
ঢাকা বোর্ডে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৪ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯৪ হাজার ২৩৬ জন পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। তারা ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি উত্তরপত্রের পুনর্নিরীক্ষণ চেয়েছিলেন। এরপর রাজশাহী বোর্ডে ১ হাজার ৪০৩টি, কুমিল্লায় ৪ হাজার ৭৩, যশোরে ১ হাজার ৯৪৪, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৯৭৫, বরিশালে ৩ হাজার ১১৮, সিলেটে ২ হাজার ৫৮৭ এবং দিনাজপুরে ৫ হাজার ৬৩৬টি উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে।
নতুন করে জিপিএ ৫ পাওয়ার শীর্ষে ঢাকা বোর্ড: পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে নতুন করে জিপিএ ৫ পাওয়ার দিক থেকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড শীর্ষে রয়েছে। এ বোর্ডে নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯০৬ শিক্ষার্থী। এরপর রয়েছে ময়মনসিংহ বোর্ডে ৭৭৭ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ২৯৩, দিনাজপুরে ২৭৫, কুমিল্লায় ২০৭, যশোরে ১৮২, সিলেটে ১২১, বরিশালে ১১২, চট্টগ্রামে ৮৩, রাজশাহীতে ৭৭ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৬ জন। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে সব মিলিয়ে পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী।
ফেল থেকে পাস— শীর্ষে ময়মনসিংহ বোর্ড: ফেল থেকে পাস করা হারে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে ময়মনসিংহ বোর্ডে। এ বোর্ডে ১ হাজার ১৮০ জন ফেল থেকে পাস করেছে। গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ৫ হাজার ৩২১ জনের এবং ৬ হাজার ৫৩৮টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন হয়েছে। নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৭৭৭ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছে ৩ হাজার ৬৬৬ জন। মাদ্রাসা বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছে ২৫৫ জন।
এর আগে ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ১৭ আগস্ট রাতে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হয়। আবেদন শেষ হওয়ার ২৪ দিন পর এবং মূল ফল প্রকাশের ৩১ দিন পর গতকাল পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এবারই প্রথমবারের মতো পুনর্নিরীক্ষণের আওতায় উত্তরপত্রের নম্বর ও ফল যাচাইয়ের পাশাপাশি পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়াও যুক্ত করা হয়েছে।



