যোগ্য শিক্ষক ও বিশাল অবকাঠামো থাকলেও গবেষণায় পিছিয়ে ছিল বাউবি
- সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সম্প্রসারিত হচ্ছে বাউবির শিক্ষা কার্যক্রম

বাউবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। ছবি: সাইখ আল তমাল
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান মুখোমুখি হয়েছেন আগামীর সময়ের। কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যত কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাইখ আল তমাল।
প্রশ্ন : আপনাকে অভিনন্দন প্রথমেই দায়িত্ব পাওয়ার জন্য। নতুন উপাচার্য হিসেবে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা বা ভিশন কি?
উপাচার্য : ধন্যবাদ আপনাকে এবং আপনার সঙ্গে যারা আছেন সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে জাতীয় ১৯৯২ সালে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রচলিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নির্দিষ্ট বয়স বা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা না থাকায়, বাউবি দূর শিক্ষণ ও ব্লেন্ডেড মেথডের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। মূলত নানা আর্থসামাজিক কারণে মূলধারার শিক্ষাবঞ্চিত শ্রমজীবী, পেশাজীবী, গৃহিণী, প্রবাসী ও বয়োবৃদ্ধদের শিক্ষার আওতায় আনাই এর মূল লক্ষ্য। শিক্ষার্থী ভর্তির দিক থেকে এটি বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
বর্তমানে মূল ক্যাম্পাসের বাইরে বাউবির ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৬৩টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও সৌদি আরবসহ বিদেশের ৭টি দেশে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।
উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার প্রধান লক্ষ্য হলো, গত তিন দশকের এই সাফল্যকে আরও সম্প্রসারিত করা। বাউবির অধিকাংশ শিক্ষার্থীই শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত; তাই তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা আমাদের অন্যতম কাজ। শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আমার দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাউবিকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের বর্তমান ভিশন ও চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্ন : আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তি বা এআইয়ের যুগে তাল মিলিয়ে বাউবিকে এগিয়ে নিতে কোনো সীমাবদ্ধতা বা প্রতিবন্ধকতা আপনি দেখতে পাচ্ছেন কি?
উপাচার্য : আবারও আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডাটা ও রোবোটিক্সের অগ্রগতির কারণে আগামী ১০ বছরে অনেক প্রথাগত পেশা বিলুপ্ত হবে এবং নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। দূর শিক্ষণ পদ্ধতির বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বাউবি এই ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুরু থেকেই প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে। গাজীপুরের মূল ক্যাম্পাসে বাউবির একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মিডিয়া সেন্টার ও একাধিক স্টুডিও রয়েছে। এমনকি দেশের গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে এবং ই-লার্নিং প্রসারে বাউবির ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা যাতে ২৪ ঘণ্টাই ক্লাসের কনটেন্ট বা মডিউল দেখতে পারেন, সেজন্য সম্প্রতি আমরা ‘ই-টিভি’ চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বাউবি সফলভাবে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করবে।
পাশাপাশি, সরকারের টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন ট্রেইনিং (টিভেট) পলিসি অনুযায়ী পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়নে বাউবি অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করছে। আমাদের ‘আইটিভেট’ প্রকল্প পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সম্প্রতি আমরা ‘কমনওয়েলথ অব লার্নিং’-এর ভারতীয় অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘সিমকা’র সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ শুরু করেছি।
প্রশ্ন : আমাদের এবারের বাজেট প্রস্তাবনা শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশের বেশি। প্রধানমন্ত্রীও তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন। সেই ক্ষেত্রে বাউবির শিক্ষার্থীদের জন্যও ভাষা শেখার সুযোগ থাকবে কিনা?
উপাচার্য : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা আছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও এ খাতে আমরা জিডিপির ২ শতাংশ স্পর্শ করতে পারিনি। শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এ বছর র আমরা সেটা পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি আগামী পাঁচ বছরে এই সরকার জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেবে।
আর তৃতীয় ভাষার ব্যাপারে বলতে গেলে বাউবি ইতোমধ্যেই বাংলা ভাষার বাইরে দুটো ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। আমাদের চীনা ও আরবি ভাষার কোর্স চালু আছে। পাশাপাশি ইংরেজিতেও আমাদের শর্ট কোর্স চালু আছে। সম্প্রতি আমাদের ডিন’স কমিটির মিটিং হয়েছে। তবে বাউবিতে গত ৩৩ বছরের যাত্রায় ডিন’স কমিটি বলতে কিছু ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার আলোকে বাউবির সাতটি স্কুল নিয়ে ডিন’ম কমিটি গঠন করেছি। তিন মাসে তিনটি বৈঠকও আমরা করেছি। সেখানে আমরা তিনটি ভাষা প্রোগ্রামকে এক ছাতার নিচে আনার ব্যাপারে আলোচনা করেছি।
সেই লক্ষ্যে আমরা আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের আদলে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করেছি। আগামী এক বছরের মধ্যে আমরা স্প্যানিশ ভাষাও যুক্ত করতে চাই। আরবি ভাষা কোর্সটির সঙ্গে আমাদের তিন বাহিনী যুক্ত আছেন। আরবি ভাষার দেশগুলোতে মিশনে যাওয়া তিনবাহিনীর সদস্যদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে আমরা যৌথভাবে কাজ করছি। সরকারের নির্দেশিত তৃতীয় ভাষাগুলো কারিকুলাম অনুযায়ী বাউবিতে চালু করা হবে।
প্রশ্ন : সাত দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে বাউবির শিক্ষাকার্যক্রম সম্প্রসারিত করার লক্ষ্য আছে কিনা?
উপাচার্য : দেশের বাইরে মূলত এখন পর্যন্ত আমাদের তিনটা কোর্স চালু আছে। এসএসসি, এইচএসসি ও বিএ/ বিএসএস। যে দেশগুলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি এবং যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়ার আগ্রহ আছে সেখানেই আমরা কার্যক্রম চালু রেখেছি। এর জন্য আমাদের ফরেইন এডুকেশন উইং রয়েছে। সম্প্রতি সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে কার্যক্রম কিছু ব্যাহত হয়েছে। তবে আমরা সেই সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। নতুন করে সিঙ্গাপুরে আমরা কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা করেছি। শিক্ষামন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে এই পরামর্শ দিয়েছেন। তার আরেকটি উদ্যোগ ছিল মালয়েশিয়াতেও কার্যক্রম চালু করা। সম্প্রতি উপাচার্য হিসেবে দুটি দেশের হাইকমিশনে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। প্রবাসীদের আরও দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে।
প্রশ্ন: বাউবির বেশিরভাগ স্টুডেন্ট হয়তো অনেক বয়স্ক বা সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়া কিংবা প্রবাসী। যারা নতুন, বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম সম্পর্কেও তেমন জানাশোনা নেই তাদের নিয়ে কোনো উদ্যোগ আপনার আছে কিনা?
উপাচার্য : বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে বর্তমানে দেড় হাজারের বেশি স্টাডি সেন্টার কাজ করছে। যেখানে নিজস্ব অনুষদের বাইরে আরও ২৩ হাজার শিক্ষক যুক্ত আছেন। সাড়ে তিন লাখের বেশি শিক্ষার্থীর এই বিশাল নেটওয়ার্কের প্রচার ও প্রসারে আমরা ঢাকার বাইরের কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করছি।
বাউবিকে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর অংশ হিসেবে সম্প্রতি রংপুরের একটি কেন্দ্রে আমাদের ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এই জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় ফেরাতে বাউবি তাদের ৬০ শতাংশ ফি মওকুফ করেছে। এইচএসসি প্রোগ্রামেও তাদের টিউশন ফি মওকুফসহ অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। এ ছাড়া, বাউবিতে প্রথমবারের মতো তৃতীয় লিঙ্গের একজন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হরিজন সম্প্রদায়ের সাত শিক্ষার্থীকেও আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমে ভর্তি করা হয়েছে।
আমাদের অনুরোধ, দেশের এনজিও ও সুশীল সমাজ যেন অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীগুলো বাউবির শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে ভূমিকা রাখে। তাদের শিক্ষার বাকি দায়িত্ব উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সানন্দে গ্রহণ করবে।
প্রশ্ন : আপনার মেয়াদকালে বাউবির শিক্ষার্থী বা যারা ভবিষ্যতে যুক্ত হতে চায় তাদের জন্য নতুন কি করতে চান?
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ হলো জ্ঞান চর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান তৈরি করা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) এতদিন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা নিয়ে কাজ করলেও গবেষণার ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। যোগ্য শিক্ষক ও সমৃদ্ধ অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাবে অতীতে কাঙ্ক্ষিত গবেষণা হয়নি। তবে সম্প্রতি বাউবিতে এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। আমাদের বর্তমান লক্ষ্য বিদ্যমান সম্মান, এমএ ও বিবিএসহ অন্যান্য প্রোগ্রামের মান অক্ষুণ্ণ রেখে বাউবি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বদলে একে একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।
সারাদেশে বাউবির ১২টি আঞ্চলিক এবং ৬৩টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রের নিজস্ব জমি ও ভবন রয়েছে। এই বিশাল অবকাঠামোর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাউবিকে বিশ্বমানের দূরশিক্ষণ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে কমনওয়েলথ অব লার্নিং, ইন্দিরা গান্ধী ওপেন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
শিক্ষকদের গবেষণার সুযোগ বাড়াতে ইতিমধ্যেই ছয়টি স্কুলের জার্নালকে ‘ডিওআই’ নম্বরসহ হালনাগাদ করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় জার্নালটি নিয়মিত করা হয়েছে। এছাড়া, ইউজিসি ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘হিড’ প্রকল্পের আওতায় বাউবির আইকিউএসি সেলের মাধ্যমে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা এবং বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাউবিকে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে নিয়ে যাওয়াই উপাচার্য হিসেবে আমার মূল লক্ষ্য। বাউবির এই স্বপ্নপূরণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা গণমাধ্যমের গঠনমূলক সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।




