বাড়ি ফিরে সাকিবা দেখলেন ‘পুরো প্রশ্নই ভিন্ন’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পরীক্ষার হল থেকে বেশ হাসিমুখেই বের হন নরসিংদীর মনোহরদী সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সাকিবা। পরীক্ষা ভালো হয়েছে তাই মনে ছিল স্বস্তি। কিন্তু বাড়ি ফিরে সহপাঠীদের সঙ্গে এমসিকিউ প্রশ্ন মেলাতে গিয়ে মলিন হলো মুখ। সাকিবা আবিষ্কার করলেন অন্যদের প্রশ্নের সঙ্গে তার প্রশ্নপত্রের মিল নেই। ২০২৬ সালের নিয়মিত পরীক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও তাকে দেওয়া হয় ২০২৫ সালের অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের বা পুরানো সিলেবাসের প্রশ্ন।
মুহুর্তেই সেই খবর জানাজানি হলে বিষয়টি ঢাকা শিক্ষাবোর্ডকে জানায় উপজেলা প্রশাসন। বোর্ডের নিদেশে পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা চারজন শিক্ষক তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার এবং কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার নির্দেশনা দেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছেন, আজ বৃহস্পতিবার ওই উপজেলার খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ঘটে এই ঘটনা। পুরনো প্রশ্নে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা চার শতাধিকের বেশি। যারা ২০২৬ সালের নিয়মিত পরীক্ষার্থী হলেও পরীক্ষা দিয়েছেন ২০২৫ সালের পুরনো প্রশ্নে।
এদিকে পুরনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের খাতা বিশেষভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানালেন ঢাকা শিক্ষাবোর্ডর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু। শিক্ষার্থীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে আশ্বস্ত করলেন তিনি।
পরীক্ষার্থীরা জানান, আজ সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে এইচএসসি বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা ছিল। মনোহরদী সরকারি কলেজের ৬১২ জন পরীক্ষার্থী ওই কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়। লিখিত পরীক্ষা শেষে বিতরণ করা হয় ৩০ নম্বরের এমসিকিউ প্রশ্নপত্র। তবে দুটি কক্ষে নতুন সিলেবাসের শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত প্রশ্ন না দিয়ে বাংলা প্রথম পত্রের ‘খ’ সেট, ১২১ কোডের পুরনো (২০২৫ সালের) প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। পরীক্ষার্থীরা প্রথমে বুঝতে না পারলেও কিছু সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী আপত্তি তুললে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর ঘটনা আড়াল করতে তাদের নতুন প্রশ্ন দিয়ে বাকিদের কাছে গোপন করা হয় বিষয়টি। পরীক্ষার পর জানাজানি হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরে অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠকে বসেন ইউএনও। তাৎক্ষণিক শিক্ষাবোর্ড থেকে বিষয়টি সমাধান করা হয়। তারপরও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দায়িত্ব অবহেলার দায়ে ইতোমধ্যে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে ৪ শিক্ষককে।
মনোহরদী সরকারি কলেজের পরীক্ষার্থী সাকিবা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, পরীক্ষার হলে আমরা বুঝতেই পারিনি যে আমাদের ভুল প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে। বাড়ি এসে উত্তর মেলাতে গিয়ে দেখি পুরো প্রশ্নই ভিন্ন। আমরা এখন ভালো ফলাফল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি।
খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নাজিম উদ্দীন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল মান্নান বলেছেন, পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের চরম অবহেলার কারণেই এমনটি ঘটেছে। বিষয়টির দ্রুত সমাধানে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।
মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম এ মুহাইমিন আল জিহান জানান, নিয়ম অনুযায়ী এক পরীক্ষার প্রশ্ন অন্য পরীক্ষায় চলে আসা প্রায় অসম্ভব। এটি কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের ভুল। ঘটনার পরপরই দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষক—হল সুপার সহকারী অধ্যাপক আরেফা সুলতানা, প্রভাষক সামছুল আলম, প্রভাষক মাহমুদুর রহমান এবং প্রভাষক মো. আক্রাম হোসেনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র সচিব মো. নাজিম উদ্দীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে শিক্ষাবোর্ড। বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে রাজধানীর বিজ্ঞান কলেজেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন একাধিক অভিভাবক। তবে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু।





