মাউশি ডিজিকে সরানোর গুঞ্জন!
- পাওয়ার ব্যালেন্স নীতি ভেঙে মন্ত্রী-ডিজির একাকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) পদে পরিবর্তন আসছে, এমন গুঞ্জনে সরগরম শিক্ষা প্রশাসন। নানা বিতর্ক, বদলি-পদায়ন বাণিজ্য, নিজস্ব বলয়ে একক আধিপত্য বিস্তার এবং শিক্ষা প্রশাসনে প্রভাবশালী বগুড়া গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েই ব্যাকফুটে চলে গেছেন বর্তমান ডিজি ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। এমন পরিস্থিতি সার্চ কমিটির মাধ্যমে বের করা তিনজন সিনিয়র অধ্যাপককে ডিজি করার একটি প্রস্তাব গেছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে আসতে পারে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদটিতে-এমনটি দাবি শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সোহেল বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের প্রথমে পিএস, তারপর মাউশির ডিজি হওয়ার পর থেকেই নানা বিতর্কে জড়ান। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠে, বদলি পদায়নে। এ ছাড়াও সিনিয়র ব্যাচকে ডিঙিয়ে জুনিয়রদের পদায়ন, অর্থের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পান সোহেলপন্থী হিসেবে পরিচিতরা। সর্বশেষ শিক্ষা প্রশাসনে থাকা বগুড়ার একটি প্রভাবশীল গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে চরম বেকায়দায় পড়ে যান তিনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন ডিজি নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে যাচ্ছে সরকার। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশে ১৬তম বিসিএসের ৩ কর্মকর্তার ফাইল এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে চলতি সপ্তাহেই আসতে পারে নতুন ডিজির ঘোষণা। তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের চেয়ার রক্ষায় সর্বোচ্চ তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান ডিজি।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত জুনের শেষের দিকে গঠন করা ৫ সদস্যের সার্চ কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুইজন অতিরিক্ত সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুইজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। শিক্ষা প্রশাসনে তুলনামূলক সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের নাম খুঁজতে গঠিত এই কমিটি ৩ জনের নাম চূড়ান্ত করে ফাইল পাঠিয়েছে। প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ মাহফুজুল ইসলাম, মাউশির (পরিচালক-কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক নাজমুল হক ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম।
এদের মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারের বগুড়া গ্রুপ মাহফুজুল ইসলামকে ডিজি হিসেবে শীর্ষে রেখেছে। দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে নাজমুল হকের নাম থাকলেও তিনি বর্তমান ডিজি সোহেলের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের হলমেট ও ব্যাচমেট হওয়ায় তার পাল্লা কিছুটা হালকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শেষ পর্যন্ত কার নাম চূড়ান্ত সবুজসংকেত আসে, সেদিকে সবার চোখ। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মাহফুজুল ইসলাম। আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তিনি আজিজুল হক কলেজে মানোন্নয়নের জন্য কাজ করছেন।
এ বিষয়ে গত সপ্তায় তার দপ্তরে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন আগামীর সময়কে বলেছেন, নতুন ডিজির নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন বা নতুন ডিজির বিষয়টি আমার জানা নেই। আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক আগামীর সময়কে জানান, ডিজি নিয়োগ হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। বিষয়টি নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
যেভাবে বগুড়া গ্রুপের দ্বন্দ্বে জড়ান
ঘটনার সূত্রপাত সম্প্রতি মাউশি অধিদপ্তরের কলেজ শাখার একজন সহকারী পরিচালক পদায়ন ঘিরে। একজন প্রতিমন্ত্রী ও বগুড়ার প্রভাবশালী একটি গ্রুপের সুপারিশে কলেজ শাখায় একজনের পদায়ন পায়। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডিজি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাকে যোগদান করা থেকে বিরত রাখেন। পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তা বগুড়ার এক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে ডিজিকে চাপ দিয়ে যোগদান করেন। এ নিয়ে ডিজির রুমে বগুড়াবলয়ের চার কর্মকর্তার সঙ্গে সোহেলের তুমুল বাগবিতণ্ডা হয়। এর পর থেকেই মূলত ডিজি সোহেলকে সরাতে একাট্টা হয় বগুড়া গ্রুপটি। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে থাকা একটি প্রভাবশালী দল এবং মাউশিতে কর্মরত সহকারী পরিচালক পদে এক কর্মকর্তার শ্বশুর (বগুড়ার এমপি)।
ব্যাচভিত্তিক দ্বন্দ্বে সোহেল ঠেকাও কর্মসূচি
বদলি পদায়নে একক আধিপত্য, বগুড়া গ্রুপ ছাড়াও শিক্ষা ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক দ্বন্দ্ব, মাউশির অভ্যন্তরীণ কোন্দল সোহেলের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্যেষ্ঠতা ডিঙিয়ে পদায়নের অভিযোগে ১৪তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশিরসহ একটি অংশ শুরু থেকেই সোহেলবিরোধী অবস্থানে। অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রীর পিএস (একান্ত সচিব) এবং পরবর্তী সময়ে মাউশি ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর সোহেল ১৬তম ব্যাচের নিজস্ব বলয় তৈরি করেন। মাউশি, এনসিটিবি, শিক্ষা বোর্ড ও নায়েমের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে ১৪তম ব্যাচকে কোণঠাসা করে ১৬তম ব্যাচ ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়। জ্যেষ্ঠতা ও মেধার চেয়ে সোহেলের গুডবুকে থাকাটাই হয়ে ওঠে পদায়নের প্রধান মানদণ্ড। এ পরিস্থিতিতে পদবঞ্চিত ও সরিয়ে দেওয়া কর্মকর্তারা একজোট হয়ে সর্বস্তরে সোহেল ঠেকাও তৎপরতা শুরু করেন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে ড. সোহেল বলেছেন, ১৪ ও ১৬তম ব্যাচ কাছাকাছি সময়ে চাকরিতে প্রবেশ করেছে। আমার ব্যাচমেটরা যোগ্য হলে পদায়ন পেতেই পারেন। তবে ১৪তম ব্যাচ দীর্ঘদিন ধরে একচেটিয়া সুবিধা পেয়েছে, এখন অন্য ব্যাচ পদায়ন পেলে সেটিকে দোষের বলা চলে না।
মাউশির পাওয়ার ব্যালেন্স ভাঙার কৌশল
শিক্ষা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, মাউশি ডিজি পদটি ঐতিহাসিকভাবেই প্রশাসনিক ভারসাম্যের একটি বড় জায়গা। সরকার সচরাচর শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষমতার বিপরীতে অন্য কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বলয়ের শক্তিশালী ব্যক্তিকে এই পদে বসাত, যাতে একক কর্তৃত্ব তৈরি না হয়। ২০০৯-২০১৮ মেয়াদে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সময়ে প্রথমে ডিজি ছিলেন প্রফেসর নোমান-উর রশীদ। পরবর্তী সময়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের বোন অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়াই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আস্থাভাজন অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান ডিজি হন।
২০১৯-২০২৪ মেয়াদে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সময়ে ডিজির দায়িত্বে আসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ভাগ্নে অধ্যাপক নেহাল আহমেদসহ আরও কয়েকজন। যারা সবাই ছিল তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর পছন্দের বাইরের। এসব মেয়াদে মন্ত্রী ও মাউশি ডিজির মেরু আলাদা থাকায় ক্ষমতার একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য ছিল- এমনটা বলছেন কর্মকর্তারা। কিন্তু বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের ২০০১-০৬ মেয়াদের পিএস এবং দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন ড. সোহেলকে এককভাবে দায়িত্ব দেওয়ায় সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে ডিজি ও মন্ত্রীর দপ্তর একাকার হয়ে একক আধিপত্য তৈরি হয়, যা নতুন সরকারের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব পদে ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে সেগুলোর পেছনে রয়েছে অর্থ। নিশ্চিন্ত শিক্ষামন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এই কর্মকর্তা নিজের ইচ্ছামতো সাজান গোটা শিক্ষা প্রশাসন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা মাউশি করিডরে কানাঘোষা ছিল-শিক্ষা প্রশাসনে এখনো গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যাচভিত্তিক আনুগত্য। পিএস সোহেল নিজের প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় বসাচ্ছেন নিজের ব্যাচমেটদের। মাউশি, এনসিটিবি, শিক্ষা বোর্ড কিংবা নায়েম- শীর্ষ সব পদে ১৬ ব্যাচের ছায়া। জ্যেষ্ঠতার বা মেধার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে সোহেলের গুডবুকে থাকাটা।






