মাউশি দুই টুকরো করার প্রস্তাব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ভেঙে দুটি পৃথক অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। তাদের যুক্তি, এতে সারা দেশে শিক্ষার গুণগত মানের যেমন উন্নয়ন হবে, তেমনি গতি আসবে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে। অবশ্য শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক-কর্মকর্তারা ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন এ ধরনের প্রস্তাবের।
মাউশি ভাঙার পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের সুপারিশ, পাবলিক পরীক্ষায় নকল ও জালিয়াতি রোধে বাড়াতে হবে শাস্তির পরিধি; প্রয়োজনে সংস্কার করতে হবে আইন।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন যখন নকলবিরোধী বক্তব্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের শিকার হচ্ছেন, ঠিক তখনই নকল ধরতে আরও দুটি ধারা নতুন করে আইনে সংযোজন করার প্রস্তাব দিলেন ডিসিরা। আজ রবিবার শুরু হওয়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে শিক্ষা খাত নিয়ে উঠে এসেছে এমন আরও কিছু প্রস্তাবনা ও সুপারিশ।
অবশ্য এসব প্রস্তাবে আছে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ রূপকল্পের প্রতিফলন।
সম্মেলনে ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর’ (মাউশি)-কে ভেঙে মাধ্যমিক স্তরের জন্য পৃথক ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর’ গঠনের প্রস্তাব দেন ময়মনসিংহ ও জামালপুরের জেলা প্রশাসক। তাদের যুক্তি, বর্তমানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদারকি করা মাউশির একার পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার মান।
তবে শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য বিষয়টি মেনে নেওয়া সহজ হবে না। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কাজ শুরু করলেও শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারির পর এগোয়নি তা।
পিরোজপুর জেলা প্রশাসক তার প্রস্তাবে তুলে ধরেছেন প্রচলিত ‘পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’-তে ৮ ও ৯ ধারা যুক্ত করার বিষয়টি। তার দাবি, দেশের সব নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষাকে পাবলিক পরীক্ষার আওতায় এনে জালিয়াতি ও নকল রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কারণ, নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষাগুলো পাবলিক পরীক্ষার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দেওয়া যাচ্ছে না তাৎক্ষণিক শাস্তি।
পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের সুপারিশ, আইনের ৮ নম্বর ধারা (উত্তরপত্র পরিবর্তন বা সংযোজন) এবং ৯ নম্বর ধারা (পরীক্ষার্থীদের সহায়তা করা) যেখানে বর্তমানে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেগুলোকে করা হোক যুগোপযোগী ও কঠোর।
তার ভাষ্য, আইনটি সংস্কার করা হলে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটরা জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবেন, যা সহায়ক হবে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মেধার সঠিক মূল্যায়নে। পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহার ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও সহায়ক হবে বলে মত তার।
সম্মেলনে পাঠদানের স্থানিক বৈষম্য দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দূর করতে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা ভাতা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তার অভিমত, অভিজ্ঞ শিক্ষকরা সাধারণত শহর এলাকায় থাকতে পছন্দ করায় দুর্গম অঞ্চলে যে পাঠদানের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, তা নিরসনে ভাতার বিষয়টি রাখবে কার্যকর ভূমিকা।
এ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন শেরপুর ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক। তারা সিলেট বিভাগের সব চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও বিদ্যমান বেসরকারি স্কুলগুলো জাতীয়করণের সুপারিশ করেছেন। তাদের ব্যাখ্যা, প্রস্তাবিত বিষয়টি সরকারের বৈষম্যহীন শিক্ষানীতির সঙ্গে সরাসরি সংগতিপূর্ণ।
কওমি ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন নেত্রকোনা ও চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক। তারা হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের সুপারিশও করেছেন। আর নওগাঁর জেলা প্রশাসক দেশের সব হাফেজিয়া মাদ্রাসার শৃঙ্খলা ও শিক্ষকদের মানদণ্ড বজায় রাখতে একটি কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের প্রস্তাব করেছেন, যে কমিটিতে থাকবেন আলেম-ওলামারা।
বগুড়া কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি শিক্ষা ও দক্ষ জনবল তৈরির জন্য একটি কৃষি কলেজ প্রয়োজন বলে প্রস্তাব দেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক।
নীলফামারী জেলা প্রশাসক সেই জেলায় পূর্ণাঙ্গ একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাবের পাশাপাশি পিরোজপুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস, আবাসিক হল ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার সুপারিশ করেছেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক। কৃষিপ্রধান জেলা হিসেবে নওগাঁয় কৃষিভিত্তিক কারিগরি ও প্রফেশনাল কোর্স চালুর সুপারিশও করেন ডিসি।



