রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
স্মার্ট কার্ড প্রকল্পে ম্যানুয়াল গতি
- ২৮ সেবার প্রতিশ্রুতি, চালু মাত্র ২টি
- ১০ বছরেও কাটেনি স্মার্ট কার্ডের জট
- শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় দেড় কোটি টাকা
- কার্ড ছাপা ১ লাখ ২১ হাজার সেবা অধরা
- গ্রন্থাগার, হল, বাস, ইন্টারনেটেও নেই কার্ডের ব্যবহার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ডিজিটাল ক্যাম্পাসের স্বপ্ন নিয়ে চালু হয়েছিল স্মার্ট আইডি কার্ড প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল এক কার্ডেই নিশ্চিত করা আবাসিক হল, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাস, ইন্টারনেট, পেমেন্ট, মেডিকেলসহ ২৮ ধরনের সেবা। কিন্তু গত ১০ বছরে ওই ২৮টি সেবার মধ্যে কার্যকর হয়েছে মাত্র দুটি। বাস্তবায়নের ‘ম্যানুয়াল গতির’ কারণে আটকে রয়েছে বাকি ২৬টি সেবা। অথচ এ সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থেকে স্মার্ট কার্ড বাবদ দেড় কোটি টাকার বেশি আদায় করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০১৭ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মিজানউদ্দিন স্মার্ট আইডি কার্ড চালু করেন। কার্ডে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পরীক্ষার নম্বরপত্র ও সনদ উত্তোলন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বিভাগ, হল অফিস, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, মেডিকেল, বাস, নিরাপত্তা, পেমেন্ট, ইন্টারনেটসহ যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল ২৮ ধরনের সেবা।
তবে প্রায় এক দশক পরও নেই আবাসিক হল, জিমনেসিয়াম, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রবেশ ও বই ইস্যু, প্রশাসন ভবন, বাস সার্ভিস কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহারে স্মার্ট কার্ডের কার্যকর ব্যবস্থা। হলগুলোতে এখনো বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে প্রচলিত পরিচয়পত্রেই।
শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম তানবীরের অভিযোগ, স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয় করার কথা বলা হলেও বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই এসব পরিকল্পনার। মেডিকেল ও ফরম পূরণ ছাড়া অন্যান্য সেবায় এখনো ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দিতে হয়। কার্ডের জন্য ফি নেওয়া হলেও অন্যান্য সেবায় এর কার্যকর ব্যবহার নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, জুলাই ২০১৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত স্মার্ট আইডি কার্ড প্রকল্পের আওতায় ছাপানো হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৯০০টি কার্ড। নভেম্বর ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ‘স্মার্ট আইডি কার্ড সেল’-এর মাধ্যমে আরও ১০ হাজার এবং এর আগে আরেকটি প্রকল্পের আওতায় ছাপানো হয় ৬ হাজার ১১২টি কার্ড। সব মিলিয়ে ছাপানো হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ১২টি কার্ড।
তবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের অভিযোগ, কার্ডের বহুমুখী সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবায়নে প্রশাসনের ন্যূনতম সদিচ্ছাও তারা দেখেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ৪০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে ৪০ হাজার ৫৪৬ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে। এতে আদায় হয়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ টাকা। কার্ডের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুত সেবার বড় অংশই রয়ে গেছে কাগজ-কলমে।
স্মার্ট আইডি কার্ড প্রকল্পের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. একরামুল হামিদের ভাষ্য, স্মার্ট কার্ডের কার্যক্রম পুরোপুরি আইসিটি সেন্টারের অধীনে এলে বিষয়টিকে বাস্তবায়ন করা হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। এর আগেও সিন্ডিকেটে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল, তবে এখনো তা কার্যকর হয়নি।
কার্ডের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে এটিকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেমে রূপান্তর করতে হবে উল্লেখ করে তিনি জানালেন, এ লক্ষ্যে প্রশাসন পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিভিন্ন সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা করলে সুবিধা পাবেন কার্ড ব্যবহারকারীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলছিলেন, ‘আমাদের নতুন স্মার্ট কার্ড নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা কার্ডের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ইন্স্যুরেন্স সুবিধা যুক্ত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। পাশাপাশি ব্যাংক লেনদেনও যেন একই কার্ডের মাধ্যমে করা যায়, সে বিষয়েও কাজ করছি।’
অনেক সময় কোনো শিক্ষার্থীর হাতে তাৎক্ষণিক টাকা না থাকলে সেক্ষেত্রে স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারবে এবং পরে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকবে— যোগ করলেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কার্ড দিয়েই শিক্ষার্থীরা নানা সুবিধা পেয়ে থাকেন উল্লেখ করে বলছিলেন, ‘আমরাও সেই মডেল অনুসরণ করে এগোতে চাই। তবে এসব বাস্তবায়নে ইউজিসির সহযোগিতা অপরিহার্য। তাদের সহায়তা ছাড়া পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা কষ্টসাধ্য হবে।’



