জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মেডিকেল কর্তার ওষুধ কেলেঙ্কারি!
- মেডিকেল সেন্টারের ওষুধ গায়েব
- সিএমওর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ

ছবি: আগামীর সময়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) মেডিকেল সেন্টারে ওষুধের গরমিলকে কেন্দ্র করে বেরিয়ে এসেছে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য। অভিযোগ উঠেছে ওষুধ কেলেঙ্কারি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবাকে বিপর্যস্ত করেছেন প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা (সিএমও) ডা. শামসুর রহমান।
এদিকে, ওষুধের গরমিলের অভিযোগে ট্রেজারারকে সভাপতি করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে স্টোর শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. নুর-এ-কামাল পিংকুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান এ ব্যাপারে দুটি পৃথক অফিস আদেশ জারি করেন।
বিস্তর অভিযোগ সিএমওর বিরুদ্ধে: সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক হুসনী মোবারকের একটি ফেসবুক পোস্ট এবং শিক্ষার্থীদের নানা সূত্রে জাবি মেডিকেলের এই হযবরল অবস্থা ও প্রশাসনিক অনিয়মের চিত্র সামনে আসে।
ডা. শামসুর রহমান নিজের চেম্বারটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় এমনভাবে স্থাপন করেছেন, যেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা তার অবস্থান সম্পর্কে জানতেই না পারে। রোগীদের নিয়মিত সেবা না দিয়ে সময় কাটানোই ছিল যেন তার প্রধান কাজ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত এক মাসে মাত্র আট দিন চেম্বারে বসে তিনি গড়ে ১৫-২০ জন রোগী দেখেছেন।
মেডিকেল সেন্টারের জরুরি অ্যাম্বুলেন্সকে তিনি ব্যক্তিগত যাতায়াতের কাজে ব্যবহার করতেন; এমনকি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজপড়ুয়া নিজের মেয়ের জন্য বাসা থেকে রান্না করা খাবার, কাপড়চোপড় ও বিশেষ পানীয়জল সরবরাহের কাজেও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া মেডিকেলে রোগী আনা-নেওয়ার রিকশায় তাকে বাড়ির বাজার করতে দেখেছেন কেউ কেউ।
স্বজনপ্রীতি ও অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে তিনি মেডিকেল সেন্টারকে একটি ‘পারিবারিক ব্যবসায়’ পরিণত করেছিলেন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তিনি আত্মীয় মেহেদী হাসানকে কম্পিউটার সহযোগী এবং নিজ গ্রামের শরিফুলকে কম্পিউটার টাইপিস্ট হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন।
তার বিরুদ্ধে মেডিকেলের ফ্রিজে পর্যাপ্ত টিটেনাস ভ্যাকসিন থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীদের তা না দেওয়া এবং পরে নতুন ভ্যাকসিন কেনার নামে প্রায় ৯ লাখ টাকার ভুয়া বা অতিরিক্ত বিল তোলার তদন্ত চলছে। এ ছাড়া করোনা ও ডেঙ্গু মহামারীকালে নির্ধারিত ক্রয় কমিটিকে পাশ কাটিয়ে নিজের লোক দিয়ে লাখ লাখ টাকার রিএজেন্ট ও কিট কিনে অর্থ আত্মসাৎ করারও অভিযোগ রয়েছে। বিসিএস ক্যাডার অ্যালামনাই কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া দুটি অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর মেশিনের একটি দীর্ঘদিন নিজের বাসায় রাখার পর তা গায়েব করে একটি সাধারণ মানের মেশিন দিয়ে প্রতিস্থাপন করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক হুসনী মোবারক বলছেন, অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অপসারণ, অনিয়মের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়ন এবং পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও অভিজ্ঞ ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে প্রশাসনের কাছে।
অভিযোগ আংশিক স্বীকার করে শামসুর রহমান বলছেন, ‘ওষুধ স্টোরের দায়িত্বে ডেপুটি রেজিস্ট্রার নুর-এ-কামাল পিংকু। চাবির দায়িত্বেও তিনি। তবে যেহেতু খোঁজ নিতে পারিনি, সেহেতু আমার আংশিক দায় রয়েছে।’ অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে মেয়েকে খাবার পাঠানো বিষয়ে বলেলেন, ‘যখন অ্যাম্বুলেন্স সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে যায় তখন পাঠানো হয়েছে; এ ছাড়া কখনো পাঠানো হয়নি।’ মেডিকেলের রিকশা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘আমরা নিয়মানুযায়ীই এটি ব্যবহার করি। হয়তো কেউ কখনো হাতে বাজারসামগ্রী দেখেছেন, সেজন্য এই অভিযোগ করছেন।’ প্রায় ৯ লাখ টাকার ভুয়া বিল তোলার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বললেন, এসব নিয়ে তদন্ত চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান বলছেন, ‘আমরা বিষয়গুলো জেনেছি। নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




