দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে আইবিএ গ্র্যাজুয়েটদের রাজত্ব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বেকারের দেশ। মাটি কাটা দেখতেও শ শ মানুষ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। চাকরি বা কর্মসংস্থান এখানে ‘বরাত’— যোগ্যতা নয়। সেই দেশের একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী চাকরিতে ঢুকে পড়েন। অনেকে ছাত্রত্বের গণ্ডি পেরোনোর আগেই। শিক্ষার্থী, অভিভাবক এমনকি আমজনতার কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা আইবিএ— সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতীক। করপোরেট জগতেও সমান সুনাম। ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার আগেই অনেক শিক্ষার্থীর কাছে নিজের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি চায় করপোরেটওয়ালারা।
দেশি বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আইবিএ গ্র্যাজুয়েটদের দাপুটে পদচারণা। কেউ উদ্যোক্তা হয়ে নতুন কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলছেন। কেউবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশের। শ্রেণিকক্ষের তত্ত্বকে বাস্তবতার কষ্টিপাথরে যাচাই করতে করতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বগুণ শানিত হয়। ফলে কর্মক্ষেত্রে তারা শুধু চাহিদাসম্পন্নই নন, অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে তারা বিকল্পহীন। মেধা, কর্মদক্ষতা ও পেশাদারত্বের ত্রিবেণী এনে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।
আইবিএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৬৫টিরও বেশি জাতীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষার্থীরা। উল্লেখযোগ্যের মধ্যে রয়েছে কোকা-কোলা, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, নেসলে বাংলাদেশ, রবি আজিয়াটা, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, এইচএসবিসি বাংলাদেশ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ, কেপিএমজি, ডেলয়েট, আইএফসি, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, বিকাশ, মারিকো বাংলাদেশ, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।
শুধু বাংলাদেশেই নয়— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন আইবিএ অ্যালামনাইরা।
প্রতিষ্ঠানটি দেখাচ্ছে, প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী স্নাতক করার পরপরই কর্মসংস্থানে যুক্ত হন। অনেকে শেষ সেমিস্টারেই বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির অফার পান। দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান কখনো কখনো ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টের মাধ্যমে আইবিএ শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দেয়।
আইবিএর ভর্তি পরীক্ষা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। লিখিত পরীক্ষার পর মুখোমুখি হতে হয় কার্যকর মৌখিক পরীক্ষার, যা নেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও। মৌখিক পরীক্ষার সময় দেখা হয় উদ্ভট পরিস্থিতি কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারেন শিক্ষার্থীরা। স্মার্টলি নিজেকে উপস্থাপন করার সক্ষমতা। একই সঙ্গে চিন্তার ধরনে বৈচিত্র্যও দেখা হয়। মাত্র ১২০ জনকে ভর্তি করা হয় প্রতি বছর। কিন্তু ফরম ছাড়া হয় পাঁচ হাজার। নম্বরের ভিত্তিতে শীর্ষরাই শুধু আবেদন করতে পারেন।
বছর দুয়েক আগে আইবিএ পরিচালিত এমপ্লয়ার সার্ভেতে দেশের ৫৯টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল ৩২ দশমিক ২ শতাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানি। ২২ শতাংশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তি, তৈরি পোশাক, অটোমোবাইল, সিরামিক, কনসালটিং, টেলিযোগাযোগ, উন্নয়ন সংস্থা এবং উৎপাদন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জরিপে দেখা যায়— ৫৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা মনে করেন, আইবিএ শিক্ষার্থীরা চাকরিতে যোগদানের প্রথম দিন থেকেই কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত। সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী দক্ষতা, শেখার আগ্রহ এবং যোগাযোগ দক্ষতায় তারা অন্যদের তুলনায় এগিয়ে। নেতৃত্ব বিকাশে আইবিএ গ্র্যাজুয়েটদের উচ্চসক্ষমতা রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী— প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে ৪৬ শতাংশ ‘চমৎকার’, ১৪ শতাংশ ‘অসাধারণ’, ফাইন্যান্সিয়াল রিস্ক অ্যানালাইসিসে ৩৭ শতাংশ ‘চমৎকার’ ১৫ শতাংশ ‘অসাধারণ’, গ্রাহকসেবায় ৩১ শতাংশ ‘চমৎকার’, ১৯ শতাংশ ‘অসাধারণ’, ক্যারিয়ার অগ্রগতিতে ৫৪ শতাংশ ‘চমৎকার’ ১৭ শতাংশ ‘চমৎকারেরও ঊর্ধ্বে’।
চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরিতেও আইবিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আইবিএর বহু সাবেক শিক্ষার্থী সফল স্টার্টআপ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স, কনসালটিং ফার্ম ও উৎপাদন শিল্প গড়ে তুলেছেন। ডিগ্রি প্রদানের বাইরে আইবিএ দেশের সরকারি, বেসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিত ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে।
লিডারশিপ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ফাইন্যান্স, সাপ্লাই চেইন, মার্কেটিং, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, করপোরেট গভর্ন্যান্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত হাজারো অ্যালামনাই নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গাইডলাইন, মেন্টরশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেন। এ কারণেই অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আইবিএ গ্র্যাজুয়েটদের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমাগত বাড়ছে।
আইবিএর সাবেক পরিচালক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ ফেরহাত আনোয়ার বলেছেন, ‘আইবিএর শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় চাকরির ক্ষেত্রে আলাদা গুরুত্ব পায়। তাদের চিন্তাভাবনা ও শেখার ধরনও ভিন্ন। তারা যে প্রশিক্ষণ পায়, সেটাও অন্যদের থেকে আলাদা। এখানে পড়াশোনায় শুধু পুরনো তথ্য বা তত্ত্বের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয় না। বরং এমন বিষয় শেখানো হয়, যা বর্তমান সময়ে দরকারি এবং ভবিষ্যতেও কাজে লাগবে— বিশেষ করে যখন পুরনো জ্ঞান একসময় আর কাজে আসে না।’
১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের অ্যাকাডেমিক এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় আইবিএ। সে সময় দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক ব্যবসায় শিক্ষা ছিল সীমিত। আন্তর্জাতিকমানের ব্যবসায় প্রশাসন শিক্ষা এবং দক্ষ করপোরেট নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যেই যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
আইবিএর পরিচালক অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ বললেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা নয়; এমন নেতৃত্ব তৈরি করা, যারা দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।’
প্রথমদিকে শুধু এমবিএ প্রোগ্রাম থাকলেও পরে এমফিল, পিএইচডি এবং ১৯৯৩ সালে বিবিএ প্রোগ্রাম চালু হয়। বর্তমানে বিবিএ, এমবিএ, এক্সিকিউটিভ এমবিএ, ডিবিএ, এমফিল ও পিএইচডি— বিভিন্ন স্তরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে আইবিএ।




