বিশ্ব জুড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে এআই
সফলতা যেমন ব্যর্থতাও তেমন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কৃত্রিম সংকট ও অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে এআইভিত্তিক আধুনিক ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তৈরি হতে যাওয়া এ প্রযুক্তি ১০ বছরের বাজার তথ্য, স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আগাম ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করবে।
বর্তমানে একটি তথ্যের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক করতে হয়, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটায়। অথচ এআই ব্যবস্থা চালু হলে বিশ্ববাজারের অবস্থা ও দেশীয় ঘাটতির সঠিক পূর্বাভাস মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পাওয়া সম্ভব হবে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো, বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আগেই তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি নেওয়া।
বিশ্বের বহু দেশ এরই মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা ও সাপ্লাই চেইন পরিচালনায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়, যেখানে ৯০ শতাংশ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও এআই ও ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে বৈশ্বিক আবহাওয়া, শিপিং রুট ও বিভিন্ন দেশের উৎপাদন সংকটের তথ্য আগেই ট্র্যাক করা হয়। ফলে সংকট সৃষ্টির আগেই তারা বিকল্প বাজার থেকে পণ্য আমদানির ব্যবস্থা করতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও এআই প্রযুক্তির সাহায্যে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাফল্য ও ব্যর্থতার উভয় অভিজ্ঞতা রয়েছে। নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দেশটির সরকার কৃষিপণ্য ও খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে ‘ই-ওয়ালেট’ ও ডেটা প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নিলেও মাঠপর্যায়ের সমন্বয়হীনতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। সেখানে মূলত প্রত্যন্ত অঞ্চলের ম্যানুয়াল ডেটা সঠিক সময়ে ডিজিটাল সিস্টেমে যুক্ত না হওয়া, ইন্টারনেটের অপ্রতুলতা এবং সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য শেয়ারিংয়ের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একইভাবে কেনিয়া এবং ভারত কৃষি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করলেও প্রাথমিক পর্যায়ে ভুল উপাত্ত এবং প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে পূর্বাভাসের নিখুঁত কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। তবে পরে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো জোরদার এবং মাঠপর্যায়ের ডেটা এন্ট্রি ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করার মাধ্যমে তারা ইতিবাচক ফল পেতে শুরু করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, এআই প্রযুক্তি শুধু একটি সফটওয়্যার বা পূর্বাভাস ব্যবস্থা মাত্র; মাঠপর্যায়ের বস্তুনিষ্ঠ ডেটা সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের মজবুত কাঠামো না থাকলে এ প্রযুক্তির সুফল পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগের সম্ভাবনা অপরিসীম। ফসল ওঠার আগেই যদি জানা যায় আলু বা পেঁয়াজের ফলন কেমন হবে, তবে সে অনুযায়ী আগেভাগেই আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। এ ছাড়া এআই প্ল্যাটফর্ম বিশ্ববাজার বিশ্লেষণ করে কম খরচে পণ্য আমদানির উৎস খুঁজে দেবে এবং দেশের গুদামে কতটুকু পণ্য মজুদ আছে, তা ডিজিটালি নজরদারিতে রাখায় অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ পাবে না।
তবে উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি বাধা রয়েছে। প্রথমত, কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য আলাদাভাবে সংরক্ষিত থাকায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা দূর করতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটা শেয়ারিংব্যবস্থা চালুর প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের ম্যানুয়াল তথ্যকে ডিজিটালাইজড করা, সরকারি কর্মকর্তাদের এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি কাটাতে একটি স্বয়ংক্রিয় প্রটোকল তৈরি করা জরুরি।
উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তথ্যের ঘাটতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, সরকার তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ভালো। তবে এআই নিজে থেকে কোনো সমাধান তৈরি করতে পারে না; তাকে প্রয়োজনীয় উপাত্ত দিয়ে ট্রেইন করতে হয়। আমাদের বড় সমস্যা হলো, সময়মতো সঠিক তথ্য না পাওয়া, যা এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হতে পারে। তাই এই প্ল্যাটফর্ম সফল করতে হলে আগে মাঠপর্যায় থেকে সঠিক সময়ে তথ্য সরবরাহের কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একা নয়; বরং কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ডেটাবেইজ তৈরি করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাজার গবেষণা সংস্থার তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুরুতেই সব পণ্যে না গিয়ে পেঁয়াজ, তেল ও ডালের মতো সংবেদনশীল কয়েকটি পণ্য নিয়ে পাইলট ভিত্তিতে কাজ শুরু করলে এবং প্রশাসনিক ধীরগতি কাটাতে পারলে এ প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা দেশের বাজার ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।




