সুদ বেশি সময় কম কঠিন শর্ত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্যস্ত ইআরডি সচিব। এক বৈঠক থেকে ছুটছেন অন্য বৈঠকে। বাকি কর্মকর্তারা অনুসরণ করছেন উদ্যোম, উৎসাহ, উদ্দীপনায়। ক্ষিপ্রতায় যাওয়ার সময় সচিব শুধু বলে গেলেন, ‘আপনি পরে আসুন।’
ঠাঁয় দাঁড়িয়েছিলেন প্রতিবেদক। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর সচিবের সঙ্গে ফের দেখা— ‘আপনার সঙ্গে এক মিনিটও কথা বলতে পারছি না।’
এসব বৈঠক ঋণসহ নানা বিষয় নিয়ে। জানা গেল, বাংলাদেশের জন্য ঋণের শর্ত কিছুটা কঠিন করেছে উন্নয়ন সহযোগীরা। আর সেই কঠিন শর্ত মেনেই চার সংস্থা থেকে বাজেট সহায়তা হিসেবে ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। ঋণের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ননকনসেশনাল লোন কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে হয়েছে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক। যাতে সভাপতিত্ব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি মাস পর্যন্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট সহায়তা এসেছে বাংলাদেশে। তবে এগুলো ছিল সহজ শর্তের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর পরই রয়েছে আইএমএফ, এডিবি এবং এআইআইবি
সাধারণত বাজেট সহায়তার ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে উন্নয়নসহযোগী সংস্থাগুলো। কিন্তু এবার বাংলাদেশের জন্য শর্ত কিছুটা কঠিন।
কঠিন শর্ত বলতে কী বোঝানো হচ্ছে বা কোন ধরনের শর্ত দেওয়া হলে সেটিকে কঠিন বলা হয়, তা জানতে চাই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক কর্মকর্তার কাছে।
তিনি বলছিলেন, ‘সাধারণত বাজার দরের চেয়ে সুদের হার বেশি হলে সেই ঋণকে কঠিন শর্তের বা ননকনসেশনাল ঋণ বলে। এ ক্ষেত্রে রেয়াতকাল বা গ্রেস পিরিয়ড এবং ঋণ পরিশোধের সময়ও কম থাকে। পাশাপাশি এমন কিছু শর্ত দেওয়া হয়, যেগুলো পূরণ করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।’
বৈঠক শেষে ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর কাছে কঠিন শর্তে ঋণের বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়।
তিনি অবশ্য বললেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সব মিলিয়ে কত মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়া হবে তাও হিসাব করা হয়নি।
এটুকু বলেই আরেকটি বৈঠকে যোগ দিতে চলে গেলেন ইআরডি সচিব।
বিস্তারিত জানতে তার জন্য দুই ঘণ্টার অপেক্ষা। সেই বৈঠক শেষ করে নিজের কার্যালয়ে ঢোকার মুখে ফের তার কাছে একই প্রশ্ন, ‘কত মিলিয়ন ডলার নেওয়া হচ্ছে?’
এবারও খুব ব্যস্ত তিনি। যাওয়ার পথে শুধু বললেন, ‘এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। আমার আর একটি মিটিং আছে।’
তবে, সচিব সরাসরি কিছু না বললেও কথা বলি বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের মধ্যে একজন জানালেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), ওপেক ফান্ড এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে কঠিন শর্তে বাজেট সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করা হবে।
এরই মধ্যে এডিবি থেকে ৭৫ কোটি ডলার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বললেন, ‘স্ট্রেনদেনিং ইকোনমিক অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রাম, সাব প্রোগ্রাম-২-এর আওতায় এ অর্থ ব্যয় করা হবে। এ বিষয়ে এডিবির সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।’
এ ছাড়া এর আগেই এডিবি ২৫ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে, জানালেন তিনি।
বাজেট সহায়তা হলো, উন্নয়নসহযোগী সংস্থা বা দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে সরাসরি পাওয়া ঋণ। এই অর্থ নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ হয় না। বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতি সংস্কারে ব্যবহার করা হয়। সেই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি মেটাতেও সাহায্য করে।
অর্থমন্ত্রীর ওই বৈঠকে থাকা আরেক কর্মকর্তা বলছিলেন, মোট পাঁচটি প্রকল্পের জন্য কঠিন শর্তে বাজেট সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এর মধ্যে কোনোটিতে একক কোনো উন্নয়নসহযোগীর পরিবর্তে কো-ফাইন্যান্সিং থাকতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরও বললেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি মাস পর্যন্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট সহায়তা এসেছে বাংলাদেশে। তবে এগুলো ছিল সহজ শর্তের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর পরই রয়েছে আইএমএফ, এডিবি এবং এআইআইবি।’



