গুলিতের চোখে সিমিওনে সেরা, তবে …

সংগৃহীত ছবি
ডিয়েগো সিমিওনে সর্বকালের সেরা কোচ, এমন দাবি করছেন ডাচ কিংবদন্তি রুদ গুলিত। গত সপ্তাহে সিমিওনেকে তিনি সেরা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রাপ্য স্বীকৃতি পাচ্ছেন না ৫৫ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন কোচ। কিন্তু গুলিতের এই মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় বিশ্ব ফুটবলাঙ্গন। অনেকেই তার সঙ্গে একমত নান এই ব্যাপারে।
২০১১ সালে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল আতলেতিকো মাদ্রিদ। সিমিওনে আসার আগ পর্যন্ত দলটি লিগ এবং ইউরোপিয় প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে খারাপ করছিল। ২০১১-১২ মৌসুমের লা লিগায় আতলেতিকো ছিল পঞ্চম অবস্থানে ছিল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও পারেনি কোয়ালিফাই করতে। একই মৌসুমে কোপা দেল রে-তে তৃতীয় সারির দল আলবাসেতের কাছে হারায় চাকরি হারিয়েছিলেন গ্রেগোরিও মানজানো।
মানজানোর বিদায়ের পর ২০১১ সালের ২৩ ডিসেম্বর দায়িত্ব দেওয়া হয় সিমিওনেকে। লক্ষ্য খাদের কিনারায় থেকে টেনে তুলতে হবে আতলেতিকোকে। তার দায়িত্ব নেওয়ার পর একের পর এক চমক দেখতে থাকে রোজিব্লাঙ্কোসরা। ২০১২-১৩ মৌসুমে লিগে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে সিমিওনের দল। পরের মৌসুমে অর্থাৎ ২০১৩-১৪ মৌসুমে সবাইকে অবাক করে ১৮ বছর পর লা লিগার শিরোপা জেতে আতলেতিকো। ওই মৌসুমে বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদ ছিলো তাদের ফর্মের তুঙ্গে। এই দুই স্প্যানিশ জায়ান্টদের হারিয়ে শিরোপা জয় করা অসাধ্য সাধনের মতোই কাজ। ২০২০-২১ মৌসুমে আবারো লা লিগা উপহার দেন তিনি।
দলকে শুধু লিগ জিতিয়ে ক্ষান্ত হননি সিমিওনে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় আসর চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন বারংবার। যেখানে কোয়ালিফাই করতে বেগ পেতে হতো সেখানে তার অধীনে ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে দুইবার ফাইনাল খেলেছে আতলেতিকো । ২ বারই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালের কাছে হেরে শূন্য হাতে ফেরত আসতে হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি দ্বিতীয় বার দলকে সেমিফাইনালে তুলেছেন তিনি।
সিমিওনে আতলেতিকোতে আসার পর কৌশলগত এবং দক্ষতাগত অনেক পরিবর্তন এনেছেন। তিনি দলের জন্য রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা এবং প্রতিটি ম্যাচের জন্য সর্বোচ্চ পরিশ্রমের সংস্কৃতি তৈরি করেছেন যা ‘আতলেতিকো স্পিরিট’ নামে পরিচিত। কিন্তু সিমিওনের খেলার ধরন নিয়ে নেতিবাচক ধারণাও আছে অনেকের।
সিমেওনের প্রশংসায় যখন ফুটবল বিশ্বের অনেকে মুখর, তখন ভিন্নমতও কম নয়। সমালোচকরা অভিযোগ করেন তার ফুটবল দেখতে ভালো লাগে না। তার স্টাইল অনেকখানি রক্ষণাত্মক— ‘প্রতিপক্ষকে খেলতে দিও না, সুযোগ পেলে কাউন্টার করো।’ এটাই ছিল এই অর্জেন্টাইনের ফুটবল দর্শন, যা একসময় ফলপ্রসূ হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের দ্রুত ও আক্রমণাত্মক ধারায় এটি ক্রমশ পুরনো এবং অকার্যকর হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
২০২০-২১ মৌসুমের লিগ শিরোপার পর চার বছর ধরে কোনো ট্রফি নেই সিমিওনের ঝুলিতে। এই সময়ে দলবদলের বাজেটে কোটি কোটি ইউরো ঢেলেও সাফল্য আনতে পারেননি। জোয়াও ফেলিক্সের মতো বিশ্বমানের প্রতিভাকেও কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। বরং সম্পর্ক এতটাই তিক্ত হয় যে, ফেলিক্সকে দিয়ে দিতে হয় ধারে। সমালোচকরা বলেন, সমস্যাটা খেলোয়াড়ের নয়, কোচের অনমনীয় কাঠামোর।
সিমেওনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে যতবড় খেলোয়াড়ই হোক, তাকে দলে রাখা হয় না। এটি একদিক থেকে শক্তি, অন্যদিক থেকে দুর্বলতা। কারণ এই অনমনীয়তার ফলে দল প্রায়ই প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সেরাটা থেকে বঞ্চিত হয়।
পেপ গার্দিওলা বা ইউর্গেন ক্লপের মতো কোচরা বছরের পর বছর নিজেদের কৌশল পাল্টেছেন, খেলায় পরিবর্তন এনেছেন। সিমেওনের স্টাইল সেই তুলনায় অনেকটা একঘেঁয়ে। এই আর্জেন্টাইন কোচ নিজেও স্বীকার করেছেন, খেলা বদলে গেছে এবং তাকেও বদলাতে হয়েছে। কিন্তু সেই বদলের প্রমাণ মাঠে এখনো দেখা যায়নি।
টানা দুই মৌসুমে মৌসুমের শেষ দিকে দলের পারফরম্যান্সে ধস নামা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। কোপা দেল রে ফাইনালে রিয়াল সোসিয়েদাদের কাছে অপ্রত্যাশিত হার এবং লিগে টানা চার ম্যাচ না জেতায় প্রশ্ন উঠেছে দলের মানসিক প্রস্তুতি ও কোচের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ক্লাবের নতুন মালিকপক্ষ অ্যাপোলো স্পোর্টস ক্যাপিটাল সিমেওনের চুক্তি নবায়ন করবে কি না, বলা মুশকিল।
সিমিওনেকে সেরা দাবি করে গুলিতের মন্তব্যটি সঠিক কি না, তা-ই প্রশ্ন উঠছে। তবে একটি মাঝারি পর্যায়ের দলকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনে পরাশক্তিদের সঙ্গে লড়াইয়ের যোগ্য করে তোলার কৃতিত্ব দিতেই হবে সিমিওনেকে।



