উন্নয়নের চটকদার গ্রাফ কর্মসংস্থানে হতাশা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সে অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে; কিন্তু তাদের সবার কাজের সংস্থান হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে বেকারত্ব, ছদ্মবেকারত্ব ও নিম্ন মজুরির অনানুষ্ঠানিক কাজে নির্ভরতা। একদিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হিসাব, অন্যদিকে কাজের অনিশ্চয়তা— এই বৈপরীত্য দেশের উন্নয়ন মডেল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অর্থনীতির এ পরিস্থিতি ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ (জবলেস গ্রোথ) হিসেবে পরিচিত।
বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর যেখানে ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছে, সেখানে কাজ জুটছে মাত্র ৯ লাখের। বিবিএসের বিগত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে ৮ শতাংশ ছুঁলেও বেকারত্বের হার একই জায়গায় থমকে রয়েছে। মূলত কারখানায় প্রযুক্তির অন্ধ ব্যবহার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের নীতিগত বৈষম্য দেশকে এক বিপজ্জনক কর্মসংস্থানহীন উন্নয়নের ফাঁদে ফেলে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও সে অনুপাতে নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে নীতিগত সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের সংকট ও বাজারে অসম প্রতিযোগিতার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সে প্রশ্ন সামনে আসছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.১১ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বেড়ে ৮.১৫ শতাংশে পৌঁছায়। কিন্তু উচ্চ প্রবৃদ্ধির এ সময়ে কর্মসংস্থানের সংকট দূর হয়নি। পরে ডলার ও জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর পড়ে। এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানেও। শিল্পে কাজ হারানো অনেক মানুষ জীবিকার তাগিদে কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হতে বাধ্য হন। বিশ্বব্যাংকের শ্রমবাজারবিষয়ক তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ, বিপরীতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ। এই ব্যবধান শ্রমবাজারের চাপকে স্পষ্ট করে। তবে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ও শ্রমশক্তিতে প্রবেশকারীর হিসাব এক নয়। তাই কর্মসংস্থানের ঘাটতি বুঝতে বেকারত্বের পাশাপাশি শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ, কাজের মান ও মজুরির তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মডেলে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। দীর্ঘদিন প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয় হলেও তা পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। যে কাজ তৈরি হচ্ছে, তার বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক, স্বল্প মজুরির এবং অনিশ্চিত। বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক দুর্বলতাও এ সংকটের জন্য দায়ী।
বিশ্লেষকদের মতে, কর্মসংস্থানের বড় বাধা শিক্ষার সঙ্গে শিল্পের চাহিদার অসামঞ্জস্য। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করলেও তাদের অনেকের ব্যবহারিক ও কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে একদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী খুঁজে পায় না, অন্যদিকে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ উপযুক্ত কাজ পায় না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগের পরিবেশকেও দুর্বল করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির প্রধান লক্ষ্য করতে হবে বলে মনে করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বড় শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজশর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।



