সাক্ষাৎকার
গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘাটতিতে শিল্প খাত

এম এ হাতেম
দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হয়নি। একদিকে ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট ও অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় গ্যাস এবং বিদ্যুতের মারাত্মক ঘাটতি— এ দুই বড় বাধার মুখে স্থবির হয়ে পড়েছে উৎপাদন খাত। নতুন বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এমতাবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের পাশাপাশি সাময়িক স্বস্তি ফেরাতে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ও নীতি সহায়তার কার্যকর বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি এম এ হাতেম।
এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শিল্প খাতের নানা চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি সংকট, বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনে গঠিত বিশেষ তহবিল, এনবিআরের রাজস্ব নীতি এবং সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কথা বলেছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিকেএমইএ সভাপতি জানিয়েছেন, দেশে ব্যবসার পরিবেশের এখনো তেমন কোনো লক্ষণীয় উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সদিচ্ছা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ নীতিনির্ধারকরা এ সংকট নিরসনে অত্যন্ত সচেষ্ট। তারা যেভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন, তাতে আশা করা যায় শিগগিরই ব্যবসা-বাণিজ্য ও নতুন বিনিয়োগের জন্য একটি অনুকূল এবং ভালো পরিবেশ তৈরি হবে। সরকারের এসব প্রয়াস শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করছে।
বর্তমানে শিল্পকারখানার প্রধান বাধা গ্যাস ও জ্বালানি সংকট। সম্প্রতি প্রায় ৫৫০ কারখানা গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেও তা পাচ্ছে না। এ বিষয়ে এম এ হাতেম বলেছেন, এটি একটি বড় জাতীয় সংকট। সরকার ইচ্ছা করলেই এটি রাতারাতি সমাধান করে ফেলবে— এমন পরিস্থিতি বাস্তবে নেই। তবে সরকার উদ্যোগ নিলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। এর আগে সরকারের কিছু পদক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও অতিসম্প্রতি সংকটটি আবারও খুব প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে, গ্যাস ও জ্বালানির অভাব তীব্র হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, চলমান কারখানাগুলোর অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে পড়েছে।
এ সংকট উত্তরণে দুটি প্রধান পথ তুলে ধরেন তিনি। প্রথমত, শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে সাময়িক ও আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বহু বছর ধরে অবহেলিত থাকা দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনের জোরালো ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত নিরসন করা না গেলে বিদ্যমান ইন্ডাস্ট্রিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বন্ধ কারখানা চালু করার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা-ও বাস্তবায়িত হবে না।
শিল্প খাতের অচলাবস্থা কাটাতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালুর লক্ষ্যে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যার অধীনে এরই মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রথম ধাপের সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে বিকেএমইএ সভাপতি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে এটি নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর তালিকা পাঠানো হচ্ছে। বর্তমান গভর্নর যেহেতু অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ, তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতটা কোথায় এবং সংকটটা কোন জায়গায়। কীভাবে এগুলো সচল করতে হয়, সে জ্ঞান তার রয়েছে। তবে শুধু কাগজে-কলমে সার্কুলার জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে যেন এর দ্রুত বাস্তবায়ন হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
জাতীয় বাজেটে এনবিআরের ট্যাক্সেশন ও কাস্টমসসংক্রান্ত জটিলতা দূরীকরণে গৃহীত পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন এম এ হাতেম। তিনি অর্থমন্ত্রী এবং এনবিআরের বিদায়ী চেয়ারম্যানের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেছেন, এবারের বাজেটে তারা একটি সুষম এবং চমৎকার ভূমিকা রেখেছেন। সব খাতেই কিছু না কিছু নজর দেওয়া হয়েছে এবং ভালো ভালো নীতিনির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিকেএমইএ সভাপতি তাদের দুটি প্রধান দাবির কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো ব্যাংক খাতের তারল্য ও সুদের হারের সংকট সমাধান এবং জ্বালানি সংকটের টেকসই নিরসন।




