দুই দশকে পৌনে ২ লাখ কোটি টাকার রপ্তানি
- বন্ধ স্টিল মিল থেকে কর্ণফুলী ইপিজেড

ছবি: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর পাশে গড়ে ওঠা জমিতে একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ স্টিল মিলসের জং ধরা যন্ত্রাংশ আর পরিত্যক্ত শেড পড়ে থাকত, সেখানে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের সব কারখানা। অটোমেটেড মেশিনে তৈরি হচ্ছে দামি সব রপ্তানি পণ্য। দুই দশকের ব্যবধানে চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের পরিত্যক্ত জমিতে ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব।
২০০৬ সালে পরিত্যক্ত সেই জমিতে কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা কর্ণফুলী ইপিজেড যাত্রা শুরুর পর আজ সেখানে ৮০ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে। দুই দশকে ইপিজেডের সীমানা বাড়েনি ঠিক। কিন্তু জ্যামিতিক হারে বেড়েছে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয়। কেইপিজেডে বিদেশি বিনিয়োগ আগ্রহ থাকলেও কোনো প্লট খালি নেই। এই ইপিজেড থেকেই এখন রপ্তানি হচ্ছে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য।
সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি পরিত্যক্ত জমি যে রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হয়ে অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে, কেইপিজেড তার বড় উদাহরণ বলে মত দিয়েছেন বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (বেপজা) সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মোহাম্মদ তানভির হোসেন।
কর্ণফুলী ইপিজেডে প্রথম বছরে মোট বিনিয়োগ এসেছিল মাত্র ১.৯১ মিলিয়ন ডলার। দুই দশকের ব্যবধানে সেই প্রাথমিক বিনিয়োগ এখন ৭৮৭ মিলিয়ন ডলারে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৯ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। বর্তমানে চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বখ্যাত উদ্যোক্তাদের ৪০টি পূর্ণাঙ্গ কারখানা এখানে নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
বিনিয়োগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেইপিজেড থেকে বিশ্ববাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির চিত্রটি আরও বেশি ঈর্ষণীয়। শুরুর বছরে যেখানে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ পণ্য, সেখানে গত ২০ বছরে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৪.১৫ বিলিয়ন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি)।
কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বললেন, ‘এই বিশাল রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই এসেছে পণ্যের বৈচিত্র্য থেকে। সাধারণ টি-শার্ট বা ট্রাউজার তৈরির গণ্ডি পেরিয়ে কেইপিজেড এখন উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত হাবে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যার, ক্যাম্পিং টেন্ট ও হাই-টেক গিয়ার, বাইসাইকেল, সেফটি জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এখন তৈরি হচ্ছে ইপিজেডে।’
ইপিজেডের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ধরা হয় স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর ইতিবাচক প্রভাবকে। যখন উৎপাদন শুরু হয়, তখন পুরো ইপিজেডে শ্রমিক ও কর্মকর্তা মিলিয়ে জনবল ছিল মাত্র ১৭৪ জন। দুই দশক পর আজ সেখানে সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের। নির্মাণাধীন আরও পাঁচটি নতুন কারখানা চালু হলে কর্মসংস্থান দ্রুতই এক লাখ ছাড়িয়ে যাবে জানালেন বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আনোয়ার পারভেজ। তার ভাষ্য, ‘কেইপিজেড দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে যে ইমেজ তৈরি করেছে তাতে প্রচুর আগ্রহ আছে, কিন্তু আমাদের প্লট খালি নেই।’
কেইপিজেডের কর্মীবাহিনীর প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। পতেঙ্গা, হালিশহর এবং চট্টগ্রাম উপকূলীয় এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারীরা এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন বলে মত কর্ণফুলী ইপিজেডের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ খালিদ চৌধুরীর।
কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশকের যাত্রা নিয়ে গতকাল ইপিজেড প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বেপজা। সেখানে এই ইপিজেডে বিনিয়োগকারীরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বক্তৃতায় বিনিয়োগকারী ও ক্যাম্পভ্যালি গ্লোবাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী লী হং উ বললেন, ‘এই ইপিজেড বিনিয়োগের জন্য দারুণ স্থান। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা মিরসরাই ইকোনমিক জোনের বেপজা প্লটে বড় আকারের বিনিয়োগ করছি। দ্রুত উৎপাদন শুরু হবে।’



