প্রণোদনা প্যাকেজ
অর্থের সঠিক ব্যবহারে স্বতন্ত্র কমিটি জরুরি
- ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্যাকেজ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা

কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে
বন্ধ কলকারখানা চালুসহ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে তহবিল ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেছেন, এ তহবিলের সঠিক বিতরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরবে।
তিনি জানান, সব বন্ধ কারখানা যে চলবে, তা নয়। যেগুলো চলার মতো, সেগুলোকে সাহায্য করা দরকার। কারণ, এটার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয় জড়িত। পাশাপাশি ব্যাংক লেনদেনের ব্যাপারও আছে। তা ছাড়া অনেক কারখানা রপ্তানিমুখী। এসব দিক বিবেচনায় তহবিল ঘোষণার উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। কিন্তু মূল কথা হচ্ছে, তহবিলের অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। সেই ঋণটা আবার আদায় হয় কি না— সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখা উচিত।
তহবিল নয়ছয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি আরও জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে এটি নির্ভর করছে যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে তহবিল দেওয়া হবে, তাদের সিরিয়াসনেসের ওপর।
তহবিল অপব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে
শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেছেন, সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী। দেশের পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের বর্তমান সংকট বিবেচনায় এ ধরনের পদক্ষেপ শিল্প খাতে নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারে। তবে শুধু উদ্যোগ গ্রহণই যথেষ্ট নয়— বরাদ্দ তহবিলের যাতে কোনোভাবে অপব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে শুরু থেকেই সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। অতীতে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজে যেভাবে অনিয়ম হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে প্রয়োজনে একটি স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা আবেদনকারীদের প্রকৃত সক্ষমতা এবং যোগ্যতা যাচাই করে সহায়তার সুপারিশ করবে।
যেসব কারখানা আর্থিকভাবে এরই মধ্যে সক্ষম ও স্বাবলম্বী, তাদের এই সহায়তার আওতার বাইরে রাখাই সমীচীন। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত অর্থে সংকটে পড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা, যারা পুঁজির অভাবে কারখানা চালাতে পারছেন না। এ ছাড়া বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর মালিক, যারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং বিশেষত যারা ব্যাংকের মালিকানায়ও যুক্ত, তারা যেন রাজনৈতিক প্রভাব বা পরিচিতি ব্যবহার করে এই তহবিল থেকে সুবিধা নিতে না পারেন, সেদিকে কড়া নজরদারি রাখা দরকার।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার কঠোর ও স্বচ্ছ তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তহবিল বিতরণে যদি সত্যিকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে, তাহলেই এই অর্থ প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছাবে। তখনই অর্থনীতিতে যে শূন্যতা ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা ধীরে ধীরে পূরণ হবে এবং কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধির ধারা আবার ফিরে আসবে।
ঘোষিত তহবিলে একাধিক শিল্প খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তবে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে বিদেশি ক্রেতারা পণ্যের মান ও দামের পাশাপাশি কারখানার কমপ্লায়েন্স— অর্থাৎ শ্রমমান, পরিবেশগত মানদণ্ড ও কর্মপরিবেশকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। তাই যেসব কারখানা আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম বা সক্ষম হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
বন্ধের পথে কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে
বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেছেন, বন্ধ কারখানা আবার চালু করার বিষয়ে সরকার যথেষ্ট আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে। দেশের পোশাকশিল্পকে সচল ও গতিশীল রাখতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগকে সফল করতে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
তবে কার্যকর ফল পেতে হলে সরকারকে আগে সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। এলোমেলোভাবে সব সমস্যায় একসঙ্গে হাত না দিয়ে ধাপে ধাপে এগোনো উচিত হবে। বর্তমানে যেসব কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, সেগুলোকে আগে রক্ষা করাই প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। একটি চলমান কারখানাকে টিকিয়ে রাখা, সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাকে নতুন করে চালু করার চেয়ে অনেক কম ব্যয়বহুল ও কার্যকর। এর পরের ধাপে সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
বিজিএমইএ এরই মধ্যে সরকারকে বিভিন্ন কার্যকর পরামর্শ দিয়ে আসছে। রুগ্ণ ও বন্ধ কারখানার মালিকদের একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি কোন কারখানা ঠিক কী কারণে বন্ধ হয়েছে বা সংকটে পড়েছে, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। কারণ সমস্যার ধরন না বুঝে সমাধানে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।
সেই তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে শুধু সরকারি সহায়তাই যথেষ্ট নয়, মালিকদেরও ব্যবসা পরিচালনায় মনোবল ও দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দিয়ে কোনো টেকসই সুফল আসে না। এ ছাড়া যেসব কারখানা মালিকের ব্যর্থতা, অদূরদর্শিতা বা অব্যবস্থাপনার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে বরং যোগ্য ও আগ্রহী উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে তাদের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়াই অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে।






