সমালোচনার জবাবে শিক্ষামন্ত্রী
একক ভ্যাট ও করপোরেট করহার চায় আইএমএফ

ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সর্বত্র একক ভ্যাট ও করপোরেট করহার বাস্তবায়ন চায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ ছাড়া সদ্য ঘোষিত বাজেটে সরকার যে কর ছাড় দিয়েছে, এতে রাজস্ব আয় কী পরিমাণ কমতে পারে, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে।
সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠকে উঠে আসে এসব তথ্য। বৈঠকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এবং বাজেট প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা তিন অনুবিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বৈঠক করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকার যে নীতিগত কাঠামো ও সংস্কারের রোডম্যাপ দিয়েছে, আইএমএফ তাতে একমত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রাতারাতি কোনো কঠোর সংস্কার নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নে দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
বর্তমান ভ্যাট হার ১ দশমিক ৫, ৭ দশমিক ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ বিদ্যমান এবং করপোরেট করহার ১২ দশমিক ৫০, ২৭ দশমিক ৫০ ও ৪৫ শতাংশ আছে। আইএমএফ ওই ভিন্ন ভিন্ন হার তুলে এক হার বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর অব্যাহতি, সেটি বহাল থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে বৈঠকে। সেখানে অালোচনায় আরও স্থান পায় রাজস্ব খাতের সংস্কারের প্রসঙ্গও। জবাবে নতুন উৎস থেকে শুল্ক-কর আদায়, রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটনসহ নানামুখী উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
এদিকে সচিবালয়ে আইএমএফের বাংলাদেশ ও হংকংবিষয়ক মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বৈঠকের পর নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর্থিক খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শেয়ারবাজার, রাজস্ব প্রশাসন এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে বর্তমান সরকারের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
বৈঠক প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি কোন ভিত্তির ওপর পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়েছে। সরকার যে নীতিগত কাঠামো ও সংস্কারের রোডম্যাপ দিয়েছে, আইএমএফ তাতে একমত হয়েছে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল, সরকারের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতি আইএমএফের সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি। তিনি বললেন, একটি রাজনৈতিক সরকারের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। আইএমএফও এই অবস্থানকে সম্মান জানিয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, বর্তমান সরকারের মাত্র চার মাসের মেয়াদে আর্থিক খাতের সংস্কার, শেয়ারবাজার ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ এবং রাজস্ব আহরণে দৃশ্যমান অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সরকারের দাবি, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাত্র চার মাসে কর আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আইএমএফ।
বৈঠকে সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি, দ্বিতীয় রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি, সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজেট, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং আর্থিক খাতের সুশাসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় সন্তোষজনক অগ্রগতি হলেও এখনই ঋণ অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, বর্তমান মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে আইএমএফ প্রতিনিধিদল তাদের সুপারিশ ওয়াশিংটনে সংস্থাটির সদর দপ্তরে পাঠাবে। এরপর আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার পর আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করবে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির পথ খুলে যেতে পারে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে- স্কেল নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি।
একইভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় এলেও এখনো কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সূচি নিয়ে আলোচনা হয়নি। আপাতত নতুন কর্মসূচির নীতিগত ভিত্তি নির্ধারণেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার ছাড় পেয়েছে।




