গাফিলতি বিশ্বব্যাংকের দায় বাস্তবায়নকারীর!

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানির কার্যকর ব্যবহার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল একটি সমন্বিত উদ্যোগ। বছর পাঁচেক আগে ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট (সিএসএডব্লিউএম) নামে ওই সমন্বিত প্রকল্প পেয়েছিল অনুমোদন। সিংহভাগ অর্থায়নের কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের। বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং মৎস্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে বাপাউবোর উদ্দেশ্য পূরণই পড়েছে শঙ্কার মুখে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সমীক্ষা বলছে, বিশ্বব্যাংকের নানা গাফিলতির কারণেই হয়েছে এমনটা। অথচ এখন সে দায় পড়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের ওপর।
আইএমইডির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১ হাজার ১৮২ কোটি টাকার প্রকল্পটির পরামর্শক নিয়োগের অনুমোদন পেতেই চলে গেছে আড়াই বছর। ফলে গেছে সব ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়া। প্রকল্পটি পড়েছে অডিট আপত্তির মুখেও। অথচ চলতি মাসেই শেষ হচ্ছে মেয়াদ। বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আর খরচ হয়েছে ২০৩ কোটি টাকা।
আইএমইডির ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, সরকারি ক্রয় বিধিমালা না মানা, অনুমোদনহীন ব্যয়, অতিরিক্ত অর্থ দেওয়াসহ ১৪টি অডিট আপত্তির মধ্যে একটিরওর সুরাহা হয়নি। ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে বিদেশি ঋণের টাকার কার্যকর ব্যবহার।
আইএমইডির সমীক্ষা প্রতিবেদনের দ্বিতীয় খসড়া এসেছে আগামীর সময়ের হাতে। খসড়া প্রতিবেদনটি আগামী ৩০ জুনের মধ্যেই হবে চূড়ান্ত।
ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ আছে ৮৫০ কোটি টাকা। সংস্থাটির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্পের আওতায় সেবা ক্রয়ের প্যাকেজ-১ (কনসালটেন্সি সার্ভিস ফর ডিজাইন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন)-এর দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়নপূর্বক পরামর্শক নিয়োগেই সময় লেগেছে প্রায় ২ বছর ৫ মাস। এ কারণে প্রকল্পের শুরুতে আহ্বান করা যায়নি কোনো প্যাকেজের দরপত্র। পরামর্শক নিয়োগ করে প্রতিটি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করতে হয় ২০২৪ ও ২০২৫ সালের দিকে।
খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, সেবা ক্রয়ের ছয়টি প্যাকেজের বিপরীতে পাঁচটি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান ও চুক্তি হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সেবা প্যাকেজ-৩ (পিসিইউ সাপোর্ট এক্সপার্ট ফর প্রকিউরমেন্ট)-এর আওতায় ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুযায়ী ২০২২ সালের ৮ মার্চ চুক্তির হওয়া কথা। কিন্তু ক্রয় বিশেষজ্ঞের সঙ্গে চুক্তি করা হয় ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ প্রকিউরমেন্ট এক্সপার্ট নিয়োগ পাওয়ার আগেই প্রকল্পের এক বছর সময় চলে যায়। সময়মতো চুক্তি না হওয়ায় প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন দেরি হয়। সুতরাং ভবিষ্যতে যেকোনো বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অনুমোদনের প্রথম ৯০ দিনের মধ্যে প্রকিউরমেন্ট এক্সপার্ট নিয়োগ এবং সমান্তরাল কার্যপদ্ধতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছে আইএমইডি।
ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট: মেয়াদ শেষ চলতি মাসেই, সাড়ে চার বছরে অগ্রগতি ২৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৮৫০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি ২০২২ সালের ১৫ মার্চ স্বাক্ষর হয়। যেটি ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর আছে। তবে গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রকল্পের যে বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে, এতে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদিও অর্থছাড় প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত সমস্যা নেই, তবুও ধীরগতির কারণে অর্থছাড় রেশিও কমিয়ে দিচ্ছে, যা ঋণের পূর্ণ ব্যবহার ব্যাহত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া প্রকল্পটিতে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১৪টি অডিট আপত্তি উঠেছে। এগুলোর কোনোটিই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। অধিকাংশ আপত্তিই হচ্ছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালার ব্যত্যয়, অনুমোদন ছাড়াই অর্থ ব্যয়, চুক্তি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অতিক্তি অর্থ দেওয়া এবং বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে বিলের অসামঞ্জস্যতা। এ অবস্থায় প্রকল্পের ভাবমূর্তি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, বিশ্বব্যাংককে ঢালাওভাবে দোষারোপ করার আগে বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। কেননা প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা চিঠি দিয়েছে আর বিশ্বব্যাংক হাতগুটিয়ে বসেছিল— এমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিশ্চয়ই এখানে কোনো বিষয় আছে।
ড. জাহিদ মনে করছেন, সম্ভবত বিশ্বব্যাংকের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন অনুযায়ী মন্ত্রণালয় পরামর্শক নিয়োগ করেনি। ফলে অমতের সৃষ্টি হয়।
তিনি দাবি করেন, যেকোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে নিয়মিত মনিটরিং করে বিশ্বব্যাংক। এ ছাড়া দুই ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। এক কান্ট্রি ডিরেক্টর পর্যায়ে, দুই প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার তার বসের কাছে জবাবদিহি করেন। সেখানে একটি প্রকল্পের পরামর্শকের অনুমোদনে এত সময় লাগবে, এটা ভাবাই যায় না। এক্ষেত্রে যেসব চিঠি চালাচালি হয়েছিল, সে চিঠিগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এটি ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন মেয়াদে দেশের আটটি বিভাগের ১৭টি জেলার ২৮টি উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) সমাপ্ত করা এফসিডি/এফসিডিআই প্রকল্পের অবকাঠামো পুনর্বাসন ও আধুনিকীকরণ করা। এর মাধ্যমে জলবায়ু সহিষ্ণু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং ফসল ও মৎস্য উৎপাদন ব্যবস্থায় ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার পদ্ধতির সম্প্রসারণ করা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী পণ্য ক্রয়ের আটটি প্যাকেজের বিপরীতে পাঁচটি এবং কার্য ক্রয়ের ২৫টি প্যাকেজের বিপরীতে ৫৮টি লটের দরপত্র আহ্বান ও চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজের শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে এবং অবশিষ্ট প্যাকেজের কাজ চলমান। সেবা ক্রয়ের ছয়টি প্যাকেজের বিপরীতে পাঁচটি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান ও চুক্তি হয়েছে। প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে ইনলেট/আউটলেট পুনর্বাসন ১৯৩টির বিপরীতে ১১টি, পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ ৮৫টির বিপরীতে ১৬টি, নদী ড্রেজিং ১১ দশমিক ৯৫ কিমির বিপরীতে ১ কিমি, বাঁধ পুনর্বাসন ৩৩৫ দশমিক ৪৭ কিমির বিপরীতে ১৮ দশমিক ৪২ কিমি, নদীর তীর সংরক্ষণ ৮ দশমিক ৯২ কিমির বিপরীতে ১ দশমিক শূন্য ৩ কিমি এবং খাল পুনঃখনন ৩৪৫ দশমিক ৯৩ কিমির বিপরীতে ১১৬ দশমিক ৪২ কিমি কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় বাজার ও বসতভিটা গড়ে ওঠায় জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটি ও জায়গার স্বল্পতায় দেরি হচ্ছে নির্মাণকাজ।




