চাপে বিএসআরএম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইস্পাত খাতের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বিএসআরএমের দুই কোম্পানিতে আর্থিক চাপের ধরন ভিন্ন। বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলসের (বিএসআরএম লিমিটেড) বিক্রি বাড়লেও কমেছে মোট মুনাফার মার্জিন ও পরিচালন নগদপ্রবাহ। পাশাপাশি বেড়েছে বাণিজ্যিক পাওনা। অন্যদিকে বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডে মূল চাপ ঋণনির্ভরতায়। কোম্পানিটির মোট ঋণ ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটির চেয়েও বেশি। এর সঙ্গে বেড়েছে সুদজনিত ব্যয়। তবে মুনাফা ও পরিচালন নগদপ্রবাহও বেড়েছে কোম্পানিটির।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বিএসআরএম লিমিটেডের পণ্য বিক্রি হয়েছে ৮ হাজার ৩৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৬ হাজার ৮৮২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিক্রি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তবে বিক্রির বিপরীতে মোট মুনাফা কমেছে। প্রথম ৯ মাসে মোট মুনাফা হয়েছে ৭১২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৭ কোটি ৪ লাখ টাকা বা ১৬ দশমিক ১২ শতাংশ কম।
কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পণ্যের গড় বিক্রিমূল্য কমে যাওয়ায় মোট মুনাফায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে কাঁচামালের ব্যয় তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ফলে বিক্রি বাড়লেও প্রতি ইউনিট পণ্যে আগের মতো মুনাফা করতে পারেনি কোম্পানিটি।
মুনাফার পাশাপাশি পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদপ্রবাহও কমেছে। প্রথম ৯ মাসে বিএসআরএম লিমিটেডের পরিচালন নগদপ্রবাহ হয়েছে ৬৯৬ কোটি ৬০ লাখ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৭০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদপ্রবাহ ২৯ দশমিক ১৬ থেকে কমে ২৩ দশমিক ৩৩ টাকা হয়েছে। এদিকে ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির ট্রেড ও অন্যান্য পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪২৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে যা ছিল ২১৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে পাওনা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিক্রির অর্থ পাওনা হিসেবে আটকে থাকায় চাপ বাড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে কার্যকরী মূলধন ও নগদপ্রবাহে।
এদিকে বিএসআরএম স্টিলসের আর্থিক চিত্র ভিন্ন। ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ছিল ২ হাজার ৮৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর চলতি অংশ ২৪৭ কোটি ২ লাখ টাকা। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল ১ হাজার ৭৩৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে ফাইন্যান্স লিজসহ এ দায়ের পরিমাণ ৪ হাজার ৭৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বিপরীতে কোম্পানিটির মোট ইক্যুইটি ৩ হাজার ৬৬০ কোটি ২১ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঋণ ইক্যুইটির চেয়ে বেশি।
স্বল্পমেয়াদি ঋণের বড় অংশই অ্যাকসেপ্টেড বিলস ফর পেমেন্ট। ১ হাজার ৭৩৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার স্বল্পমেয়াদি ঋণের মধ্যে এ খাতে দায় রয়েছে ১ হাজার ৬০৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা প্রায় ৯২ শতাংশ। এক বছর আগে এই দায় ছিল ১ হাজার ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ঋণের সঙ্গে বেড়েছে সুদজনিত ব্যয়ও। প্রথম ৯ মাসে ফাইন্যান্স কস্ট হয়েছে ২৩১ কোটি ২৬ লাখ, যা আগের বছরের ২০৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকার তুলনায় ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। তবে বিএসআরএম স্টিলসের মুনাফায় উন্নতি হয়েছে। প্রথম ৯ মাসে কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৪৩২ কোটি ৩ লাখ টাকা। এতে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৯ দশমিক ১২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৪৯ টাকা।
অর্থাৎ এক কোম্পানিতে বিক্রি বাড়লেও মার্জিন ও নগদপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যটিতে মুনাফা বাড়লেও রয়ে গেছে ঋণ ও সুদজনিত ব্যয়ের বোঝা
এদিকে গত পাঁচ বছরে বিএসআরএম স্টিলসের শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৯ দশমিক ৭৬ থেকে ২০ দশমিক ৫৭ টাকার মধ্যে ছিল। এ সময়ে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। অর্থাৎ মুনাফার একটি বড় অংশ ব্যবসায় রেখে দেওয়া হয়েছে। বিএসআরএম লিমিটেডের ক্ষেত্রেও মুনাফার একটি বড় অংশ কোম্পানিতে রেখে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ঠকানোর প্রবণতা রয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত ও কোম্পানির সচিব শেখর রঞ্জন করের সঙ্গে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি কোনো মন্তব্য।



