আইপিওতে অডিটরের দায়িত্ব বাড়ছে, কমবে সময়

সংগৃহীত ছবি
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ায় অডিটরদের দায়িত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এখন থেকে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী ও বিভিন্ন নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি আইপিওর আগে পরিশোধিত মূলধন কীভাবে গড়ে উঠেছে, অর্থাৎ ‘ক্যাপিটাল বিল্ডআপ’ কীভাবে হয়েছে, তাও অডিটরের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এজন্য ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, নতুন ব্যবস্থায় আইপিও অনুমোদনের সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। তার মতে, একটি আইপিও সম্পন্ন হতে তিন মাসের বেশি সময় লাগার কোনো কারণ নেই।
আজ সোমবার ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘বিল্ডিং ইনভেস্টর কনফিডেন্স: দ্য রোল অব প্রফেশনাল বডিস ইন অডিট রিপোর্টিং, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক এক যৌথ সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি), ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস বাংলাদেশ (আইআইএবি) এবং এসিসিএ বাংলাদেশ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মাসুদ খান বললেন, এত দিন আইপিও আবেদনের ক্ষেত্রে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও বিএসইসি বিভিন্ন কাগজপত্র যাচাই করত। কোনো নথিতে অসংগতি পাওয়া গেলে কোম্পানির কাছে আবার ব্যাখ্যা চাওয়া হতো। সরকারি ব্যবস্থায় একটি চিঠি চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে নিচের পর্যায়ে গিয়ে আবার ওপরের পর্যায়ে ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। একাধিক প্রশ্ন উঠলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও দীর্ঘায়িত হতো।
এ কারণে নথি যাচাইয়ের কাজ অডিটরের মাধ্যমে করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানালেন তিনি। তার ভাষায়, ডিএসই ও বিএসইসি যে কাজটি করত— ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন— এখন সেটি অডিটর ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’-এর মাধ্যমে করবেন।
শুধু নথি যাচাই নয়, কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন কীভাবে গড়ে উঠেছে, সেটিও অডিটরের দায়িত্বের মধ্যে আনা হচ্ছে। বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেছেন, একটি কোম্পানি আইপিওতে আসার সময় তার যে পরিশোধিত মূলধন থাকে, সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ‘ক্যাপিটাল বিল্ডআপ’ যাচাইয়ের দায়িত্বও এখন অডিটরকে দেওয়া হবে।
তার মতে, এতে আইপিও প্রক্রিয়ায় একই তথ্য বারবার যাচাইয়ের প্রয়োজন কমবে এবং অনুমোদনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
মাসুদ খান বললেন, ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ চালু হওয়ার পর একটি আইপিও সম্পন্ন হতে তিন মাসের বেশি সময় লাগার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজনীয় কাজগুলো ঠিকভাবে সম্পন্ন হলে তিন মাস সময়ও বেশি হয়ে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইপিওর নতুন নিয়মে মূল্যায়নেও পরিবর্তন
আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি নতুন বিধিমালায় মূল্য আবিষ্কার ও কোম্পানির মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানালেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
তিনি বললেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইপিওর মূল্যায়ন ও মূল্য আবিষ্কারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বড় ভূমিকা থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে খুচরা বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ অনেক বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি হুবহু প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মূল্য আবিষ্কার পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, সরবরাহের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি হলে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে নতুন ব্যবস্থায় মূল্যায়ন ও মূল্য আবিষ্কারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানালেন, আইপিওর মূল্যায়ন ইস্যু ম্যানেজার, বিএসইসি ও ডিএসইর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ইস্যু ম্যানেজারের ব্যবহৃত বিভিন্ন অনুমান বা ‘অ্যাসাম্পশন’ নিয়েই প্রশ্ন করবে কমিশন।
নতুন ব্যবস্থায় ডাচ অকশন পদ্ধতিও চালুর কথা জানালেন তিনি।
অডিটের মান নিয়ে কঠোর বিএসইসি
আইপিও প্রক্রিয়ায় অডিটরের দায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি অডিটের মান নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন মাসুদ খান।
তিনি বললেন, অনেক সময় অডিটররা কম ফি নিয়ে কাজ করেন। এতে অডিটের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কোম্পানির টার্নওভার বা মোট সম্পদের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণির কোম্পানির জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে একটি ফি কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নির্ধারিত ফির চেয়ে কম নিয়ে কেউ অডিট করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বললেন, এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অডিটরকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে এবং বিষয়টি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (এফআরসি) জানানো হবে।
অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অডিটের আকার দেখবে কমিশন
অডিটর এনলিস্টমেন্টের ক্ষেত্রেও প্রচলিত যোগ্যতার কাঠামো পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। শুধু পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই কোনো অডিটর তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিট করার উপযুক্ত হয়ে যান না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেছেন, একজন অডিটর পাঁচ বছর ছোট প্রতিষ্ঠানের অডিট করে এসে তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিট করবেন— এটি যৌক্তিক নয়। বরং সাম্প্রতিক এক থেকে তিন বছরে তিনি কী ধরনের এবং কত বড় অডিট করেছেন, সেটি বিবেচনায় নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিটের জন্য আলাদা যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণের বিষয়টি বিএসইসির এজেন্ডায় রয়েছে বলেও জানালেন তিনি। এ বিষয়ে আইসিএবির কাছ থেকেও প্রস্তাবের অপেক্ষায় রয়েছে কমিশন।
সংখ্যার সঙ্গে ব্যবসার বাস্তবতা মিলিয়ে দেখতে হবে
আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও অডিটরদের ব্যবসার ধরন বুঝে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। শুধু হিসাবমান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা দেখলেই হবে না; আর্থিক বিবরণীর সংখ্যাগুলো বাস্তবসম্মত কি না, সেটিও দেখতে হবে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, কোনো কোম্পানির মুনাফা অনেক বেড়েছে, কিন্তু একই সময়ে নগদ কমে গেছে— এটি একটি সতর্কসংকেত। এক্ষেত্রে কার্যকরী মূলধনের পরিবর্তন বাস্তব কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
ইনভেন্টরি, পাওনা, দেনা এবং নগদ রূপান্তর চক্রের মতো বিভিন্ন অনুপাত বিশ্লেষণ করলে আর্থিক বিবরণীর সংখ্যাগুলো যৌক্তিক কি না; বোঝা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রপ্তানিমুখী ‘মেক-টু-অর্ডার’ কোম্পানির উদাহরণ দিয়ে চেয়ারম্যান বলেছেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সাধারণত দীর্ঘ সময়ের ইনভেন্টরি থাকার কথা নয়। ছয় থেকে আট মাসের ইনভেন্টরি দেখা গেলে সেখানে আর্থিক প্রতিবেদনের কোনো সমস্যা আছে কি না; তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেছেন, অডিটরদের শুধু হিসাবের সংখ্যা দেখা নয়, যে ব্যবসার অডিট করছেন সেটির ব্যবসায়িক মডেলও বুঝতে হবে। এ বিষয়টি অডিট পেশায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্যাটিউটরি অডিট আর ফরেনসিক যাচাই এক নয়
স্ট্যাটিউটরি অডিটের উদ্দেশ্য নিয়েও ব্যাখ্যা দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তার মতে, স্ট্যাটিউটরি অডিটের মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির আর্থিক অবস্থার ‘সত্য ও ন্যায্য চিত্র’ তুলে ধরা। এটি প্রতিটি নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাই বা ফরেনসিক তদন্ত নয়।
আর আইপিওতে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে নথি যাচাই ও মূলধন গঠনের ইতিহাস পর্যালোচনার অতিরিক্ত দায়িত্ব অডিটরদের দেওয়া হবে। এতে অডিটরদের ওপর দায়িত্ব বাড়লেও আইপিও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সময় কমবে বলে আশা করছে বিএসইসি।



