ব্যয় কমাতে এসে ঋণগ্রস্ত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ব্যাংকঋণ পরিশোধ করে সুদজনিত ব্যয় কমাতে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করেছিল ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডস। কিন্তু তালিকাভুক্তির পর সুদ ব্যয় কমা তো দূরের কথা, উল্টো কোম্পানিটি এখন ঋণের পাহাড়ে চাপা পড়েছে। ঋণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোম্পানির আর্থিক অবস্থাও বিপর্যয়ের মুখে।
২০১৭ সালে শেয়ারবাজার থেকে ১৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডস। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, সংগৃহীত অর্থের মধ্যে ৫ কোটি টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল; কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক এর উল্টো। ২০১৬ সালের জুনে কোম্পানির মোট ঋণ ছিল মাত্র ১৩.০১ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে তা প্রায় ৩৬৭৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯১.২৭ কোটি টাকায়। ঋণ বিপুল হারে বাড়ার কারণে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ দশমিক শূন্য ৯ কোটি টাকার সুদ ব্যয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮৩ শতাংশ বেড়ে ১৯.৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
ঋণের পাহাড় জমলেও কোম্পানির পণ্য বিক্রিতে অস্বাভাবিক উত্থান দেখা গেছে। আইপিও পূর্ব ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যেখানে বিক্রি ছিল ৪১.০২ কোটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৫১.৫০ কোটি টাকা হয়েছে। প্রায় ১০০১ শতাংশ বিক্রি বাড়লেও কোম্পানিটি মুনাফা ধরে রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ৬.৪২ কোটির নিট মুনাফা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে মাত্র ২০ লাখ টাকায় নেমে আসে। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটিকে ১.০২ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়।
মুনাফায় ধস নামায় শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশপ্রাপ্তিও প্রায় বন্ধ। গত ছয় বছরের মধ্যে ২০২১, ২০২৩ ও ২০২৫ সালে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি কোম্পানিটি। তবে ২০২৪ সালে মাত্র ৩ শতাংশ লভ্যাংশ পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। প্রতিষ্ঠার পর গত ২০ বছরে কোম্পানির কোনো পুঞ্জীভূত মুনাফা হয়নি। বরং ৪৯.১৭ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে ৭৩.০৮ কোটি পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে নিট সম্পদ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩.৯২ কোটি, যা শেয়ারপ্রতি মাত্র ৩.২৭ টাকা।
আর্থিক এই দুরবস্থার পাশাপাশি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোম্পানির হিসাবে একাধিক গুরুতর গরমিলের কথা উঠে এসেছে। গ্রাহকদের কাছে পাওনা ১৮৯ কোটি ২২ লাখ এবং ২০৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকার মজুদ পণ্যের বিষয়ে পর্যাপ্ত নথিপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি। ফলে এসবের অস্তিত্ব ও নির্ভুলতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ১০ কোটি ৭১ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদকে বছরের পর বছর ধরে নির্মাণাধীন দেখিয়ে রাখা এবং ডব্লিউপিপিএফ ফান্ডের ৫৮ লাখ টাকা কর্মীদের মধ্যে বিতরণ না করে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও এনেছেন নিরীক্ষক।
এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানি সচিব দেবাশীস সরকারের সঙ্গে গত এপ্রিল ও মে মাসে ফোন এবং ই-মেইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইপিওতে ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে উল্টো ঋণের পাহাড় তৈরি করা এবং আর্থিক হিসাবে নিরীক্ষকের এত গুরুতর গরমিল পাওয়া বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা। অস্বাভাবিক বিক্রি বৃদ্ধির পরও লোকসান ও লভ্যাংশ না দেওয়া সন্দেহজনক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত বিষয়গুলোর দ্রুত ও গভীর তদন্ত করা।




