প্রিমিয়ামে অর্থ তুলেও ব্যবসায় মন্দা
- তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ

সংগৃহীত ছবি
শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের পর বিভিন্ন কোম্পানির দুর্বল পারফরম্যান্স এখন বিনিয়োগকারীদের বড় উদ্বেগের কারণ। এর অন্যতম জ্বলন্ত উদাহরণ বস্ত্র খাতের কোম্পানি তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রিমিয়ামে বিপুল অর্থ উত্তোলনের পরও কোম্পানিটির মুনাফা কমার পাশাপাশি ঋণ ও সুদ ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক পরিচালক জানালেন, আগের দুটি কমিশনের (অধ্যাপক খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন) সময়ে কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে বহু কোম্পানিকে আইপিওর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তখন আপত্তি জানানো হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীদের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই এখন স্পষ্ট।
জানা গেছে, ইস্যু ম্যানেজার আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা উত্তোলন করে তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ। ওই সময় প্রতিটি শেয়ারে ১৬ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৬ টাকা করে সংগ্রহ করা হয়। ২০১৫ সালে উত্তোলিত এই ফান্ডের ৬১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মেশিনারিজ ক্রয় এবং ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আইপিও ব্যয় হিসেবে ব্যবহারের কথা জানিয়েছিল কোম্পানিটি।
তবে শেয়ারবাজারে আসার পর থেকে কোম্পানিটির ব্যবসায় শুধু নিম্নমুখী প্রবণতাই দেখা গেছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মাত্র ৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে তসরিফা, যা ইস্যু মূল্যের বিপরীতে মাত্র ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অথচ ব্যাংকে আমানত রাখলেও কমপক্ষে ১০ শতাংশ মুনাফা নিশ্চিত পাওয়া যেত।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেয়ারবাজারে আসার আগে তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজের মুনাফায় টানা উত্থান ছিল। ২০০৯ সালে নিট মুনাফা ছিল ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। চার বছরে ৩৯৯ শতাংশ বেড়ে ২০১৩ সালে তা দাঁড়ায় ৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকায়। কিন্তু আইপিওর পর এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মুনাফা কমে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকায় নেমেছে, যেখানে শেয়ারপ্রতি আয় মাত্র শূন্য দশমিক ৭৫ টাকা।
এর আগের দুই অর্থবছরেও মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ কোটি ৮ লাখ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা মুনাফা হয়। মুনাফার এই পতন ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও অব্যাহত আছে। আগের অর্থবছরের ৯ মাসের শূন্য দশমিক ৪৭ টাকার ইপিএস ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে শূন্য দশমিক ২৫ টাকায় নেমে এসেছে।
আইপিওতে বিপুল অর্থ উত্তোলনের পরও ব্যবসায় মন্দার পাশাপাশি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে কোম্পানিটি। আয়ের বড় অংশই এখন ব্যাংকের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, ২০১৩ সাল শেষে মোট ঋণ ছিল ১৮ কোটি ৪ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে তা বেড়ে ২০৪ কোটি ৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৩১ শতাংশ।
ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুদজনিত ব্যয়ও। ২০১৩ সালের ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকার সুদ ব্যয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ কোটি ১০ লাখ টাকায় ঠেকেছে। আইপিও-পরবর্তী সময়ে সুদ ব্যয় বেড়েছে ৭১৬ শতাংশ।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে কোম্পানি সচিব হায়দার আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে ও ইমেইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে প্রিমিয়ামে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এতে শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত এসব কোম্পানির নিরীক্ষক, ইস্যু ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা।




