অর্থ উত্তোলনের জন্য কৃত্রিম মুনাফা
- আমরা নেটওয়ার্কসের আইপিও-রাইট শেয়ার ইস্যুতে কৌশল

তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাত বিশ্ব জুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আমরা নেটওয়ার্কসের ব্যবসার চিত্র যেন উল্টো। শেয়ারবাজার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের আগে কোম্পানিটির মুনাফা ও লভ্যাংশে উত্থান দেখা যায়। কিন্তু অর্থ উত্তোলনের পরই শুরু হয় মুনাফার পতন। দুই দফা অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেই একই চিত্র দেখা গেছে। সর্বশেষ মুনাফা থেকে লোকসানে চলে গেছে কোম্পানিটি।
আমরা নেটওয়ার্কসের আর্থিক ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালের আইপিও এবং ২০২৪ সালের রাইট শেয়ার— দুই দফা অর্থ উত্তোলনের আগেই কোম্পানিটির মুনাফা বেড়েছে। কিন্তু অর্থ হাতে পাওয়ার পর তারা তা ধরে রাখতে পারেনি। ফলে অর্থ উত্তোলনের আগে মুনাফা বৃদ্ধির স্থায়িত্ব নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন আগামীর সময়কে বললেন, ‘শেয়ারবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের আগে প্রায় সব কোম্পানিরই মুনাফা বাড়তে দেখা যায়। এর একমাত্র কারণ অর্থ উত্তোলনের আগে কৃত্রিম মুনাফা দেখানো। অর্থ উত্তোলনের পর বেরিয়ে আসে অধিকাংশ কোম্পানির ব্যবসায় পতনের তথ্য।’
২০১৭ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসে আমরা নেটওয়ার্কস। আইপিওতে প্রাতিষ্ঠানিকদের কাছে ৩৯ টাকা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৫ টাকা দরে শেয়ার বিক্রি করে তারা ৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। আইপিওর আগে ২০১১ সালে শেয়ারপ্রতি ১ টাকা ৫৩ পয়সার মুনাফা বেড়ে ২০১৫ সালে হয় ৩ টাকা ১৬ পয়সা। তবে আইপিওর পর ইপিএস কমতে থাকে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইপিএস ৪ টাকা ১ পয়সা থেকে কমে ৪ টাকা, পরের বছর ৩ টাকা ১৯ পয়সা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ টাকা ১৪ পয়সা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ টাকা ৮৫ পয়সায় নেমে আসে।
রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তুতির সময় আবার মুনাফায় বড় উত্থান দেখা যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইপিএস বেড়ে দাঁড়ায় ৩ টাকা ৬৪ পয়সা। ওই বছর নিট মুনাফা হয় ২২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং ১১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কোম্পানিটি। এরপর ২০২৪ সালে দুটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার ইস্যু করে তারা। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে ২০ টাকা প্রিমিয়ামসহ প্রতিটি রাইট শেয়ারের দাম ধরা হয় ৩০ টাকা। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি সংগ্রহ করে ৯২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
দুই দফায় শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১৪৯ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে কোম্পানিটি। আইপিওর অর্থের একাংশ ঋণ পরিশোধ ও বাকিটা ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহারের কথা ছিল। রাইট শেয়ারের অর্থের মধ্যে ২১ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ ও অবশিষ্ট অর্থ ব্যবসার উন্নয়নে ব্যয়ের কথা জানানো হয়।
কিন্তু রাইট শেয়ারের পরও মুনাফার উত্থান টেকেনি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৩ টাকা ৬৪ পয়সা ইপিএস পরের অর্থবছরে কমে হয় ২ টাকা ৪৬ পয়সা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা মাত্র ১৩ পয়সায় নেমে আসে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই ২০২৫-মার্চ ২০২৬) শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪৪ পয়সা; যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ইপিএস ছিল ৭৭ পয়সা।
লভ্যাংশেও একই চিত্র। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৬ বছরই ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে তারা। রাইট শেয়ারের আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে লভ্যাংশ ১১ শতাংশ করা হলেও উত্তোলনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা শূন্য দশমিক ১০ শতাংশে নেমে আসে।
বর্তমানে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৯২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বাইরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা ৬৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গত ৬ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে শেয়ারদর ছিল ১৭ টাকা ৭০ পয়সা। ফলে ৩০ টাকা দরে রাইট শেয়ার কেনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বর্তমান বাজারদর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে আমরা নেটওয়ার্কের কোম্পানি সচিব সৈয়দ মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘সবকিছুই অ্যাকাউন্টসে বিস্তারিত দেওয়া আছে। এ নিয়ে ব্যাখ্যা চাইলে আমার আসলে কিছু করার নেই।’



