মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা
- শেয়ারবাজারে পাঁচ বছরে ‘শূন্য’ রিটার্ন
- ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাজার ছেড়েছেন ৯ লাখ বিনিয়োগকারী
- বিগত বছরগুলোয় রিটার্ন ভালো না হলেও এ বছর পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে- জানালেন বিএমবিএ সেক্রেটারি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শেয়ারবাজারে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার ঝুলি মো. রাকিবুল ইসলামের। ২০০৮ সাল থেকে এই বাজারের নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী তিনি। মাঝে কিছুটা বিরতি দিয়ে নতুন আশায় ফিরলেও প্রাপ্তির খাতাটা শূন্য। আক্ষেপের সুরে তিনি বলছিলেন, লাভের হিসাব তো দূরের কথা, অনেক সময় পুঁজি নিয়ে নিরাপদে বের হয়ে আসাই কঠিন লড়াই হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু রাকিবুল নন, গত পাঁচ বছর দেশের শেয়ারবাজার অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর জন্যই ছিল অনিশ্চয়তা ও আস্থা সংকটের সময়। ২০২১ সালের ঊর্ধ্বমুখী বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের যে স্রোত দেখা গিয়েছিল, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছরের সূচকের পতন ও স্থবিরতায় তা সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেছে। পুঁজি হারিয়ে এ সময়ে বাজার ছেড়েছেন প্রায় ৯ লাখ বিনিয়োগকারী। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩০ জুন দেশে সক্রিয় বিও হিসাব ছিল ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩১টি, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৬০ হাজার ৫২৩টিতে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীদের নীরব প্রস্থানের প্রধান কারণ ছিল দীর্ঘস্থায়ী ‘ফ্লোর প্রাইস’। এর ফলে তারল্য আটকে যায় এবং বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করতে না পেরে আস্থা হারান। ২০২১ সালে যেখানে দৈনিক লেনদেন ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল, গত দুই বছরে তা নেমে এসেছে কয়েকশ কোটিতে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত পাঁচ বছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশের আশপাশে। এই সময়ে যারা শেয়ারবাজারের ঝুঁকিপূর্ণ পথে না হেঁটে ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রে আস্থা রেখেছিলেন, তারা মূল্যস্ফীতির মধ্যেও প্রকৃত অর্থে মুনাফা অর্জন করেছেন (যদিও কিছু ব্যাংক অভ্যন্তরীণ জটিলতায় আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে)।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের নভেম্বরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ‘ডিএসইএক্স’ ৭ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেলেও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নেতিবাচক প্রবণতায় ২০২৫ সাল শেষে সূচকটি দাঁড়ায় ৪৮৬৫ পয়েন্টে। তবে ২০২৬ সালে এসে বাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘গত পাঁচ বছরে অধিকাংশ কোম্পানি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে। সুশাসন নিশ্চিত করা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে। বাজারে ইতিবাচক ধারা ফেরাতে সুশাসন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এখন জরুরি।’
ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত তিন বছরে তাদের সক্রিয় ক্লায়েন্ট সংখ্যা ৩০-৪০ শতাংশ কমেছে। যারা টিকে আছেন, তারা শুধু ‘ব্লুচিপ’ শেয়ারের দিকে নজর দিচ্ছেন। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী প্রাধান্য দিচ্ছেন ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট বা সঞ্চয়পত্রকে।
ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারী রাকিবুল ইসলাম নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘কোম্পানিগুলো কারসাজি করে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিলে জরিমানা করা হয় মাত্র ৫ লাখ। এই লঘু শাস্তির কারণে কারসাজিকারীরা হয়ে উঠছে আরও বেপরোয়া।’
তবে বাজারকে এখনো সম্ভাবনাময় মনে করছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সেক্রেটারি সুমিত পোদ্দার। তিনি বললেন, ‘বিগত বছরগুলোয় রিটার্ন ভালো না হলেও এ বছর পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ব্যাংকে এফডিআর করলে হয়তো ৯ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যাবে, কিন্তু শেয়ারবাজারে ভালোমানের কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলে লভ্যাংশ ও ক্যাপিটাল গেইন— উভয় ক্ষেত্র থেকেই লাভবান হওয়া সম্ভব।’




