নতুন করে খোঁজা হচ্ছে পুরনো দুর্নীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তদারকি সক্ষমতা জোরদার করতে নতুন একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এর আগে বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-টু (এফএসএসপি-২)’ শীর্ষক নতুন প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে আগের ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট’ (এফএসএসপি) বাস্তবায়নের কার্যকারিতা ও অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে রাখা এবং অতীতে অর্থ চুরির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, নতুন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এতে সরকারের নিজস্ব অর্থের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের ঋণও রয়েছে। চলতি বছর শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুনে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্পের আওতায় আর্থিক খাতের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো এবং পরামর্শক সেবা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি আর্থিক খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার, ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারের কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হবে।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সফটওয়্যারের দুর্বলতার কারণে অতীতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া ও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে সব তথ্যভাণ্ডার ও তথ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নতুন প্রকল্পের ৮৪ শতাংশ ব্যয় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অতীতে যেসব সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যৎ ক্রয়প্রক্রিয়ায় কালোতালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পাশাপাশি আগের প্রকল্পে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা তদন্তের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বৈঠকে বলেছেন, প্রকল্পটি মূলত বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা কর্মসূচির একটি অংশ। এর ধারাবাহিকতায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাইরে আরও তিনটি উপাদান রয়েছে, যেগুলোর ঋণচুক্তি এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তির সরঞ্জাম ও পরামর্শক প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, নতুন প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজস্ব জনবলকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। সফটওয়্যারের সোর্সকোডসহ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে রাখার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন। এ ছাড়া আগের প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিব, আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের প্রধান বা যুগ্ম প্রধান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এবং আইএমইডির সংশ্লিষ্ট খাতের মহাপরিচালক।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রথম পর্যায়ের ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট ২০১৫ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছিল ২৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা তৎকালীন হিসাবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।



