‘বেস্ট’ প্রকল্পে বাজে অবস্থা
- ২৮০১ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের ঋণের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে
- বাস্তবায়নে হযবরল অবস্থা নিন্দিত প্রকল্পের উদাহরণ
পরিবেশ উন্নয়নে একটি কৌশলগত প্রকল্পের নাম ‘বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’ (বেস্ট) নামের সঙ্গে মিল আছে উদ্দেশ্য ও মূল কার্যক্রমের। সম্ভাবনা ব্যাপক। ফলে বিশ্বব্যাংকের মতো স্বল্প সুদের ঋণ প্রদানকারী সংস্থাও করেছে অর্থায়ন। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন পর্যায়ে মন্দ কর্মকাণ্ডের ফলে এখন একটি নিন্দিত প্রকল্পে উদাহরণে পরিণত হয়েছে। শুধু কী তাই, বিদেশি ঋণের কার্যকর ব্যবহার এবং নানা অসংগতির কারণে প্রকল্পে সুফল পাওয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রশ্নের। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ছয় ধরনের ঝুঁকিও। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনের খসড়ায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। এরপর দ্বিতীয় খসড়ার পরই জুন মাসে এটি চূড়ান্ত করা হবে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, এ প্রকল্পটি একনেকে যেমন অনুমোদন পেয়েছে, তেমনি বিশ্বব্যাংক বোর্ডেও ঋণ অনুমোদন হয়েছে। কিন্তু কথা হলো রেডিনেসের অবস্থা বিবেচনা করা হয়নি কেন। অর্থাৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কতটুকু প্রস্তুত ছিল বা আদৌ ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। প্রায় তিন বছরে যদি এ অবস্থায় থাকে, তাহলে আর বাাকি দুই বছরে কীভাবে সম্ভব? এখানে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া সাধারণ সমস্যাগুলোও নতুন নয়, তা হলে আগে থেকেই কেন সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এটিও বড় প্রশ্ন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পটি একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উন্নয়ন উদ্যোগ, যার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া দূষণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সবুজ বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২,৯৯৫ কোটি ৫৮ লাখ ৭৫৯ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১৯৪ কোটি ২৮ লাখ এবং বিদেশি ঋণ থেকে ২,৮০১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা খরচের লক্ষ্য।
এদিকে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে এটি চারটি প্রধান কম্পোন্যান্টের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ কাজ করছে যৌথভাবে পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে পেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় তিন বছর।
এবার নজর দেওয়া যাক বাস্তবায়নের দিকে। রাজস্ব খাতে তুলনামূলক অগ্রগতি হলেও মূলধন খাতে বিশেষ করে অবকাঠামো নির্মাণ, ল্যাবরেটরি স্থাপন, মনিটরিং সিস্টেম এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কার্যক্রমে অগ্রগতি খুবই সীমিত। অর্থাৎ প্রায় ১ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ আউটপুট যেমন বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয় নির্মাণ, আধুনিক পরিবেশ মনিটরিং ব্যবস্থা, যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র এবং ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো এখনো বাস্তবায়ন শুরুই হয়নি।
দেখা যায়, পরিকল্পিত আউটপুটগুলো বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ফারাক রয়েছে। অধিকাংশ কার্যক্রম এখনো পরিকল্পনা বা প্রাথমিক বাস্তবায়ন পর্যায়ে আছে। ফলে প্রত্যাশিত আউটকাম অর্জন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশ মনিটরিং অবকাঠামো, দূষণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাস্তবায়নের ধীরগতির পেছনে প্রধানত ক্রয় প্রক্রিয়ার দেরি, দরপত্র আহ্বানে জটিলতা, পরামর্শক নিয়োগে পুনঃ পুনঃ ব্যর্থতা, ভূমি অধিগ্রহণে ধীরগতি এবং অর্থ ছাড়ে দেরি প্রধান ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে বৃহৎ অবকাঠামোগত কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রয় প্যাকেজের যথাসময়ে প্রক্রিয়াকরণ না হওয়ায় প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক পদে বারবার পরিবর্তন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের দুর্বলতা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করেছে।
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, আশা করছি সামনে কার্যক্রমের গতি বাড়বে। তবে এ মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলতে চাই না। অথবা পত্রিকায় নিউজ প্রকাশ হোক, সেটিও চাই না। একটু অপেক্ষা করেন।




