সুনাম ও ব্যবসা নিয়ে নিরীক্ষকের শঙ্কা
অর্থ সংকটে ডেল্টা লাইফ
- ২০২৫ সালে কোম্পানিটির নিট নগদপ্রবাহ ঋণাত্মক
- প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেও দাবি পরিশোধ করতে পারছে না

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের দাবি পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে মূল ব্যবসার নগদপ্রবাহে সংকট আরও প্রকট হয়েছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদপ্রবাহ ঋণাত্মক হয়েছে ২৪২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭০ কোটি ২৪ লাখ টাকা বেশি। এর আগেও টানা তিন বছর বড় অঙ্কের ঋণাত্মক নগদপ্রবাহ ছিল কোম্পানিটির। অর্থাৎ, নিয়মিত প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেও দাবি পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয় মেটানোর পর মূল ব্যবসা থেকে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ তৈরি করতে পারছে না ডেল্টা লাইফ।
কোম্পানিটির আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূল ব্যবসা থেকে নগদ অর্থের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ২০২৩ সালে ডেল্টা লাইফের পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদপ্রবাহ ঋণাত্মক ছিল ২৫৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর আগের বছর ২০২২ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর ২০২১ সালে নগদপ্রবাহ ঋণাত্মক ছিল ৩৭৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ, গত পাঁচ বছরের প্রতিটিতেই কোম্পানিটির পরিচালন কার্যক্রমে বড় অঙ্কের ঋণাত্মক নগদপ্রবাহ দেখা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লিখিত বক্তব্যে ডেল্টা লাইফ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোম্পানির বয়স বেশি হলে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও বীমা দাবি পরিশোধের তুলনায় সে হারে ব্যবসা বৃদ্ধি না পেলে পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হতে পারে।
কোম্পানিটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পলিসিধারীদের দাবি বাবদ নগদ পরিশোধ হয়েছে ৮৫৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। একই সময়ে নিট প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ১ হাজার ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ নিট প্রিমিয়াম আয়ের বড় অংশই দাবি পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। বছর শেষে পলিসিধারীদের বকেয়া দাবির পরিমাণও ছিল ১৭১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের শেষে এই বকেয়া ছিল ১৯২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
দাবি পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষকরাও ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, বকেয়া দাবির হিসাব তৈরিতে ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিচার-বিবেচনা প্রয়োজন এবং দাবির পরিমাণ কম দেখানোর ঝুঁকি রয়েছে। সময়মতো দাবি পরিশোধ না হলে কোম্পানির সুনাম ও ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ডেল্টা লাইফের ২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। নিরীক্ষক বলেছেন, কোম্পানির আর্থিক বিবরণী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুযায়ী যথাযথভাবে প্রস্তুত ও উপস্থাপন করা হয়নি। বরং বীমা আইন-২০১০, সংশ্লিষ্ট বিধিমালা এবং আইডিআরএর নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রচলিত শিল্পচর্চা অনুযায়ী আর্থিক বিবরণী তৈরি করা হয়েছে।
কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার দীর্ঘমেয়াদি চিত্রেও দুর্বলতা দেখা যায়। ২০২১ সালে ডেল্টা লাইফের লাইফ ফান্ড ছিল ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৭২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। চার বছরে ফান্ড বেড়েছে মাত্র ১১৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা বা প্রায় ৩ শতাংশ। এর মধ্যে ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে লাইফ ফান্ড উল্টো কমেছিল।
এর আগে ২০২১ সালে আইডিআরএর নিযুক্ত অডিট ফার্ম একনবীনের বিশেষ অন্তর্বর্তীকালীন নিরীক্ষায় ডেল্টা লাইফে ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছিল। প্রতিবেদনে কর ও ভ্যাট বকেয়া, ভুয়া খরচ ও ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং, বীমা দাবি বকেয়া এবং লাইসেন্স-সংক্রান্ত অনিয়মের মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল।
এসব বিষয়ে ডেল্টা লাইফ থেকে পাঠানো লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়েছে, ২০২১ সালে নিরীক্ষক তাদের অসংগতি বুঝতে পেরে অনিয়মের প্রতিবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। এ ছাড়া ডেল্টা লাইফ ৪০ বছরের কোম্পানি হওয়ায় শুধু প্রিমিয়াম আয় দিয়ে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও বীমা দাবি পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।



