দুর্গাপূজা ঘিরে কিছুটা চাঙ্গা গ্রামীণ অর্থনীতি

শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের গ্রামীণ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নগদ অর্থপ্রবাহ ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা, প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সজ্জা এবং পরিবহন খাতে বাড়তি চাহিদার কারণে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র তৈরি হয়েছে বিপুল কর্মসংস্থান। এ বছর ১৬ অক্টোবর থেকে দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, দুর্গাপূজা ঘিরে প্রতি বছর দেশে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। তবে আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে এবারের পূজায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল লেনদেন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কারিগর, দর্জি ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে বাড়তি আয়ের দারুণ সুযোগ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ঝুলন ধর আগামীর সময়কে বললেন, ‘দুর্গাপূজা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য ও স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থান তৈরি করে। প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরিতে ব্যবহৃত বাঁশ, খড়সহ নানা কাঁচামাল গ্রাম থেকে সংগ্রহ করায় প্রান্তিক কারিগররা সরাসরি লাভবান হন। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে এই পূজার অবদান অন্তত ১০ শতাংশ।’
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে পূজার আয়োজন হয়েছে ২৫৯টি মণ্ডপে। ১৬১০ সালে এ ভূখণ্ডে দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হওয়ার পর এর আকার ও আয়তনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। গত সাত দশকে দেশে নতুন একটি মধ্যবিত্ত ও অতিধনী শ্রেণি তৈরি হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজাগুলোয় জৌলুশ যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশব্যাপী মণ্ডপের বিস্তৃতি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রায় ৩৫ লাখ পরিবার রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। উৎসব উপলক্ষে হিন্দু পরিবারগুলো নতুন কাপড়, প্রসাধনসামগ্রী, যাতায়াত ও আপ্যায়ন বাবদ সাধারণ সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে থাকে। প্রতিটি পরিবার পূজায় গড়ে অতিরিক্ত ২০-৩০ হাজার টাকা ব্যয় করে। ফলে শুধু পরিবারগুলোর অতিরিক্ত খরচই দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, একটি মণ্ডপের পরিচালন ব্যয় ন্যূনতম ১ লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। গড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরলে দেশব্যাপী মণ্ডপগুলো ঘিরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। মণ্ডপগুলোর এই উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয়ের অর্থের প্রবাহ সরাসরি প্রান্তিক কারিগর, মৃৎশিল্পী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পকেটে যায়। বাঁশ, কাঠ, খড় ও মাটি সরবরাহকারী থেকে শুরু করে ডেকোরেটরদের আর্থিক লেনদেন উৎসবের সময় বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে গ্রামের মণ্ডপগুলোকে কেন্দ্র করে বসা মেলাগুলো প্রান্তিক অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। মেলায় বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রী, মাটির খেলনা এবং স্থানীয় খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
এ ছাড়া পূজার প্রসাদ ও আতিথেয়তার জন্য গ্রামে উৎপাদিত কৃষিজ পণ্যের চাহিদা এই সময়ে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে মণ্ডপ দর্শনার্থীদের যাতায়াত বাড়ায় গ্রামীণ অভ্যন্তরীণ পরিবহন যেমন অটোরিকশা, ভ্যান ও খেয়া নৌকার মাঝিদের দৈনন্দিন আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। সামগ্রিকভাবে পূজার এই বিশাল আয়োজন গ্রামীণ কৃষি, অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থা ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসার চাকা সচল রাখতে এক বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।



