বর্ষপণ্য ঘোষণা শুধু কাগজেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছর একটি পণ্য বা খাতকে ‘বর্ষপণ্য’ ঘোষণা করে আসছে সরকার। লক্ষ্য ছিল, নীতিসহায়তা, করছাড় ও প্রণোদনার মাধ্যমে নতুন খাতের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো। তবে বাস্তবে এ উদ্যোগের সুফল মিলছে না। এক বছর পরপর বর্ষপণ্য বদলালেও আগের খাতের অগ্রগতি মূল্যায়ন, দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সম্ভাবনাময় অনেক খাতের জন্য বর্ষপণ্য ঘোষণা কার্যত কাগুজে উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও ব্যবসায়ী সংগঠনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্ষপণ্য ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে একটি খাতকে শক্ত অবস্থানে নিতে যেখানে পাঁচ থেকে সাত বছর ধারাবাহিক নীতিসহায়তা প্রয়োজন, সেখানে প্রতি বছর নতুন খাতকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আগের খাতগুলো কার্যত আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। প্রচারধর্মী এ উদ্যোগটি একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর অভাবে অনেকটাই বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর নতুন পণ্যের নাম ঘোষণা করা হলেও বিগত বছরগুলোর পণ্যের অগ্রগতি কতটুকু হলো, তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি তদারকি বা মূল্যায়ন নেই।
২০২২ সালে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) পণ্য ও সেবাকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করা হয়। করছাড়ের মতো সুবিধা মিললেও ব্যাংকিং পেমেন্ট ব্যবস্থার জটিলতা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতিতে প্রত্যাশিত রপ্তানি সম্প্রসারণ হয়নি। ২০২৩ সালে পাট ও পাটজাত পণ্য বর্ষপণ্য হলেও কাঁচা পাটের বাজারে অস্থিরতা ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ধীরগতিতে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।
২০২৪ সালে চামড়াজাত পণ্য ও জুতা এবং ২০২৫ সালে হস্তশিল্প ও অপ্রচলিত গ্রামীণ পণ্যকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করা হয়। তবে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে উদ্বেগ থাকায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন ও উন্নত বাজারে প্রবেশে বাধা রয়ে গেছে। অন্যদিকে, হস্তশিল্পের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বিপণন ও পণ্য পরিবহনে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতিও কাটেনি।
চলতি ২০২৬ সালের বর্ষপণ্য কাগজ ও প্যাকেজিং খাত। কিন্তু কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চশুল্ক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অভিযোগ করছেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, বছরের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এ খাতের সমস্যা সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বর্ষপণ্য ঘোষণার পরও তারা এখন পর্যন্ত কোনো সুবিধা পাননি। তার ভাষ্য, বছরের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা সরকারের অন্য কোনো দপ্তর তাদের নিয়ে বসেনি। সম্প্রতি এক বৈঠকে তারা সমস্যাগুলো লিখিতভাবে জানিয়েছেন। ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস মিললেও বাকি তিন মাসে কতটা সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তার মতে, তাদের জন্য বর্ষপণ্য ঘোষণা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ।
অবশ্য ইপিবি সূত্র বলছে, বর্ষপণ্য হিসেবে কাগজ ও প্যাকেজিং খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগসহ কয়েকটি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্ষপণ্য ঘোষণার জন্য সরকারের আলাদা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। জাতীয় রপ্তানি নীতিমালায় এ ধরনের খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বর্ষপণ্য ঘোষণা করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশেষ সুবিধা কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে শুল্ক ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে জটিলতা থেকেই যায়। তৈরি পোশাক খাতের মতো বন্ড ও বন্দরসুবিধাও অন্য খাতগুলো সমানভাবে পায় না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, শুধু বর্ষপণ্য বা ‘এক জেলা এক পণ্য’ কর্মসূচির মতো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। স্থানীয় ও তৃণমূলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনে সহায়তা দিতে হবে। তা না হলে এসব উদ্যোগ মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।



