বিদায়ী অর্থবছরে রেকর্ড ১৯ হাজার জনশক্তি রপ্তানি করেছে বোয়েসেল

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ ১৯ হাজার ১৯৭ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছে। এটি প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ কর্মী প্রেরণ এবং আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ হাজার ১৩১ জন বা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
বোয়েসেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানিয়েছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ১৬ হাজার ৬৬ জন কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থান লাভ করেন। এক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা বেড়ে ১৯ হাজার ১৯৭ জনে পৌঁছেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বোয়েসেলের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ১৪ হাজার ৫৪৩ জন কর্মী জর্ডানে গেছেন। এছাড়া ব্রুনাইয়ে ১ হাজার ৮১২ জন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ হাজার ৪০৪ জন, মালয়েশিয়ায় ১ হাজার ৭ জন, রাশিয়ায় ৩৪২ জন, ইরাকে ৬৪ জন, জাপানে ১১ জন, হংকংয়ে ৪ জন, কুয়েতে ৫ জন এবং ফিজিতে ৫ জন কর্মী পাঠানো হয়েছে।
বোয়েসেলের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ৩৬টি দেশে মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৩৮ জন বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরাক, হংকং, কুয়েত, ব্রুনাই, রাশিয়া, ফিজি, জাপান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠাচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণেও কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রাশেদুল হক বাসসকে বললেন, ‘গত অর্থবছরের তুলনায় এ অর্থবছরে বোয়েসেলের মাধ্যমে বিদেশে জনশক্তি প্রেরণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছে বোয়েসেলের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পাওয়া।’
তিনি বলেছেন, বিগত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট রেজিমের সময় জনশক্তি রপ্তানির বাজার একটি মাত্র সিন্ডিকেট ও মাফিয়া চক্রের দখলে ছিল। ফলে স্বল্প খরচে বিদেশে যেতে আগ্রহী সাধারণ মানুষের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতনের পর সেই সুযোগ আবার ফিরে এসেছে। শুধু ফিরে আসেনি, যেসব বাজারে সিন্ডিকেট ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে বোয়েসেল সফল হয়েছে। বিশেষ করে সিন্ডিকেটের তৎপরতায় বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়েকটি শ্রমবাজার বোয়েসেলের উদ্যোগে আবার উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মোহাম্মদ রাশেদুল হক বলেছেন, ‘বোয়েসেল সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ভিত্তিতে জনশক্তি রপ্তানি করে। বিশ্বাস ও আস্থার এই সম্পর্ক অব্যাহত থাকলে বিএনপি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং আগামী পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বিদেশে জনশক্তি প্রেরণের ক্ষেত্রে বোয়েসেল একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারবে।’
সরকারের ১০ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘এ মুহূর্তে বোয়েসেলের মাধ্যমে ঠিক কতজন কর্মী বিদেশে যেতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর মাত্র প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বোয়েসেলের মাধ্যমে গেছেন।’
বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, ‘সরকার যদি স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে সিন্ডিকেটের প্রভাব থেকে বৈদেশিক শ্রমবাজারকে মুক্ত করে স্বল্প খরচে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সুযোগ আরও বাড়াতে চায়, তাহলে বোয়েসেলকে কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। মানুষের সেবা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা যত ভালোভাবে মানুষকে সেবা দিতে পারব, ততই ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা বিদ্যমান শ্রমবাজারগুলোকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি অতীতে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাজারগুলো পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় নতুন শ্রমবাজারও চিহ্নিত করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান, বন্ধ এবং সম্ভাবনাময়— এই তিনটি শ্রেণিতে বাজারগুলোকে ভাগ করে কোথায় কী ধরনের সুযোগ রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরির ওপর।’
জানতে চাইলে বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. শওকত আলী বাসসকে বলেছেন, চলতি অর্থবছরে ৪০ হাজার জনশক্তি পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বোয়েসেল।
বোয়েসেলের তথ্য অনুযায়ী, এ লক্ষ্য পূরণ হলে বোয়েসেল গত অর্থবছরের রেকর্ড ভেঙে দ্বিগণের বেশি জনশক্তি রপ্তানি করে অনন্য রেকর্ড করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (বৈদেশিক নিয়োগ) নূর আহমেদ বাসসকে জানান, গত জুলাই মাসে বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক হাজার ৪৩১ জন কর্মী পাঠানো হয়েছে।
আমরা বর্তমানে আমাদের বিদ্যমান বাজারের বাইরে গিয়ে নতুন করে বাজার বর্ধিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
বর্তমানে মঙ্গোলিয়ায় বাজার বর্ধিত করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত শিগগিরই চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।





