শর্তের বেড়াজালে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা

সংগৃহীত ছবি
দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদানের পরও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের বিরাট অংশ। এসব উদ্যোক্তাকে প্রযুক্তিগত অদক্ষতা এবং নানা শর্তের বেড়াজাল পার করতে হয়। এতে এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্য পূরণ হয় না। ফলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে তাদের জন্য ঋণ বরাদ্দ থাকলেও তা পূরণ হয় না। আর ২০২৫ সালের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বিতরণের লক্ষ্য থাকলে পূরণ হয়েছে মাত্র ১৬ শতাংশ। যদিও ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ঋণের কমপক্ষে ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের শেষে দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংকের মোট স্থিত ঋণের মধ্যে সিএমএসএমই ঋণের অংশ ছিল প্রায় ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। টাকার অঙ্কে প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা।
এদিকে করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ সরকার ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা ঋণ তহবিল গঠন করে। এই ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। আবার করোনাকালে প্রথম পর্যায়ে (জুলাই ২০২০-জুন ২০২১) পর্যন্ত ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১৫ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায় (জুলাই ২০২১-মে ২০২২) পর্যন্ত ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১০ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। এখানে স্পষ্ট বরাদ্দ করা প্রণোদনা বা ঋণের লক্ষ্য থেকে বঞ্চিত এসব উদ্যোক্তা।
ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলা এবং শিল্পায়নের প্রসারে এ খাতের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। তবে উচ্চ সুদের হার, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মতো নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এজন্য প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাসহ সব বাধা দূর না করলে অর্থায়ন বঞ্চিত সমস্যা বারবার সামনে আসবে।
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য বেসরকারি মহাজন, এনজিও বা অনানুষ্ঠানিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। এসব উৎস থেকে অর্থ পাওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও সুদের হার অনেক বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং ব্যবসার লাভজনকতা কমে। এসএমই খাতকে শক্তিশালী করতে হলে ব্যাংকগুলোর ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এ খাতে ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সাল শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরে এসএমই ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১১১ দশমিক ২১ শতাংশ। তবে এই ঋণের পরিমাণ তালিকাভুক্ত ১ কোটি ১৭ লাখ উদ্যোক্তার জন্য কোনোভাবে যথেষ্ট নয়।
তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে। একই সঙ্গে এই খাতই সৃষ্টি করেছে তিন কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান, যা বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বিশাল অংশকে ধারণ করে। শিল্প খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান এসএমইনির্ভর হওয়ায়, বড় শিল্প নয়; বরং ছোট ও মাঝারি উদ্যোগই দেশের কর্মসংস্থানের প্রকৃত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের কৃষি খাত, বাজেট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ইডকল, বিআইএফএফএল এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।




