মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি
- ঢাকা-কুয়ালালামপুর প্রথম দফার আলোচনা শুরু আজ

ঢাকায় শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ-সংক্রান্ত প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা। দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে এই চুক্তি চূড়ান্ত করার বড় লক্ষ্য নিয়ে আজ মঙ্গলবার ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদল মুখোমুখি হচ্ছে।
এর আগে চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দ্রুততম সময়ে এফটিএ সম্পন্ন করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। সেই সফরের ধারাবাহিকতায় এবার আনুষ্ঠানিকভাবে এফটিএর নেগোশিয়েশন টেবিলে বসছে ঢাকা-কুয়ালালামপুর। দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে অংশ নিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. রশিদি সাইদের নেতৃত্বে দেশটির ৩০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় পৌঁছেছে। প্রথম দফার এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন এবং উপপ্রধান আলোচক হিসেবে রয়েছেন একই অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মুস্তাফিজুর রহমান।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ হলো দুটি বা ততোধিক দেশের মধ্যকার একটি বিশেষ বাণিজ্যিক সমঝোতা, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে চুক্তিভিত্তিক দেশগুলোর মধ্যে পণ্য ও সেবা আদান-প্রদানে বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধাগুলো উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা বা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণ বা গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বাংলাদেশের বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা বা জিএসপি ধীরে ধীরে উঠে যাবে, ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্য তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। এই বৈশ্বিক শুল্ক-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে এফটিএ এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিই (ইপিএ) এখন বাংলাদেশের মূল কৌশলগত পথ।
বাণিজ্যিক নীতিতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মূলত উন্নত দেশগুলোর দেওয়া একতরফা শুল্কমুক্ত সুবিধার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাই দ্বিপক্ষীয় এফটিএ স্বাক্ষরে বাংলাদেশ এতদিন কিছুটা ধীরগতিতে চলেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালে ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশ তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বা পিটিএ স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে দুটি দেশ নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শুল্কছাড় দেওয়া শুরু করে। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশ তার প্রথম সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে দুই দেশের বর্তমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এক বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ করা যায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬-এর জুলাই পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় প্রায় ৩০৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে একই সময়ে মালয়েশিয়া থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ কোটি ডলার। ফলে বাণিজ্যের ভারসাম্য বর্তমানে বাংলাদেশের অনুকূলে থাকলেও দুই দেশের বাণিজ্যের সামগ্রিক পরিধি আরও বিস্তার করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম দফার এই বৈঠকে মূলত দুই দেশের পূর্বপ্রস্তুত করা খসড়া প্রস্তাবনা বিনিময়সহ বাজারে পারস্পরিক প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে। বাংলাদেশ প্রাধান্য দিচ্ছে মালয়েশিয়ার বিশাল হালাল পণ্যের বাজার ধরা, তৈরি পোশাক রপ্তানির সুবিধা বাড়ানো এবং মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান সুরক্ষার বিষয়টিকে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশে তাদের পাম অয়েল, রাসায়নিক পণ্য, ইলেকট্রনিকস এবং অটোমোবাইল খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজশর্তে ও কম শুল্কে রপ্তানির সুযোগ পেতে আগ্রহী।
এই এফটিএ আলোচনার অগ্রগতির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ জানালেন, এটি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সূচনা বৈঠক। প্রথম বৈঠকে মূলত দুই দেশ তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা ও বাণিজ্যিক সুবিধার প্রাথমিক দিকগুলো পর্যালোচনা করবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের পর বাণিজ্যিক আলোচনায় যে নতুন গতি এসেছে, তাতে প্রয়োজনীয় দরকষাকষি শেষে দুই দেশ খুব দ্রুত একটি পারস্পরিক লাভজনক ও ফলপ্রসূ মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে বলে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ মনে করছে।



