সিএসআরের অর্থে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক অনুদান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সিএসআরের টাকায় রাজনৈতিক দলকে অনুদান দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি শিশু ও জবরদস্তিমূলক শ্রম বন্ধ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তা লুকিয়ে সিএসআরের অর্থ কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যয় করতে পারবে না। এমন বিধান রেখে দেশের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খসড়া নীতিমালা ২০২৬ প্রণয়ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেখানে আরও বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম শ্রম অধিকার ও মানবিক মর্যাদা লঙ্ঘন করলে বৈদেশিক অনুদান দিয়ে সিএসআরে ব্যয় করতে পারবে না।
অংশীজনদের মতামত নিয়ে এটি চূড়ান্ত করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া েগছে এসব তথ্য।
সূত্র আরও জানিয়েছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর-পূর্ব মুনাফার ন্যূনতম ১ শতাংশ ব্যয় করা বাধ্যতামূলক এবং ভিত্তিহীন ‘পরিবেশবান্ধব’ বা ‘কার্বন নিউট্রাল’ দাবি এবং অতিরঞ্জিত প্রচার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় জবরদস্তিমূলক শ্রম, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে প্রাথমিক পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ছাড়া পণ্যের গুণগত মান, ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাকে বিভ্রান্ত না করা নীতিমালার অন্যতম শর্ত। যেকোনো শিল্প বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম দ্বারা স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে (যেমন : নদীর পানিদূষণ বা বায়ুদূষণ), তাদের জন্য সহজে অভিযোগ করার সুযোগ রাখতে হবে। পরিচয় গোপন রেখে সৎ উদ্দেশ্যে অভিযোগকারীকে সুরক্ষা দেওয়ার বিধানও নীতিমালায় রাখা হয়েছে।
খসড়া নীতিতে বলা হয়, সরাসরি পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক দল বা উদ্দেশ্যে অনুদান, কর্মকর্তা-পরিচালকের ব্যক্তিগত সুবিধা এবং জরিমানা সিএসআর খাতে গণ্য হবে না।
জানা গেছে, সিএসআর খাতকে বিচ্ছিন্ন ও উদ্দেশ্যহীন অনুদানের সংস্কৃতি থেকে বের করে এনে একটি সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুখী কাঠামোর মধ্যে আনতে এ নীতিমালা করা হচ্ছে। পাশাপাশি গঠন হবে ‘জাতীয় সিএসআর সমন্বয় কমিটি’। সেখানে সেরা পারফরম্যান্সের জন্য ‘জাতীয় সিএসআর পুরস্কার’ চালু হবে। নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে সামাজিক দায়বদ্ধতার এক নতুন রূপান্তর ঘটবে বলে যোগ করেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্যাংক-বীমা, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও নির্দিষ্ট আয়ের বড় কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতি অর্থবছরে কর-পূর্ব মুনাফার ন্যূনতম ১ শতাংশ সিএসআরে ব্যয় বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে খসড়ায়।
খসড়া নীতিমালায় নতুন বিষয় যুক্ত: আগের ছকবাঁধা ধারণাকে ভেঙে এই নীতিমালায় কয়েকটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও আধুনিক আন্তর্জাতিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নীতিমালার ১৬ অনুচ্ছেদে প্রামাণ্য ভিত্তি ছাড়া নিজেদের ‘পরিবেশবান্ধব’, ‘জিরো ওয়েস্ট’ বা ‘কার্বন নিউট্রাল’ দাবি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিএসআরের মূল বাজেটের তুলনায় প্রচারণায় অযৌক্তিক ব্যয় করা যাবে না বলে লাল দাগ টেনে দেওয়া হয়। এ ছাড়া শুধু কত টাকা খরচ হলো, তা দিয়ে সিএসআরের সফলতা মাপা হবে না। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বাধীন বা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ‘ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ পরিচালনা করতে হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রকল্প থেকে সমাজ বা পরিবেশ সত্যিই উপকৃত হয়েছে, যা আগের নীতিমালায় ছিল না। ফলে সিএসআরের অর্থ নিয়ে বিগত সময় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। সিএসআরের অর্থ ব্যয় হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্ন খাতে।
নীতিমালায় অনুযায়ী আগামীতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব ‘সিএসআর কমিটি’ গঠন করতে হবে। পাশাপাশি সিএসআরের জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং অব্যবহৃত টাকা পরবর্তী বছরে ব্যবহারের স্পষ্ট কারণ প্রকাশ করতে হবে। অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে মোট বাজেটের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রশাসনিক ব্যয়ের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান সমন্বয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠন করা হবে, যা জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের (এসডিজি) সঙ্গে করপোরেট অর্থপ্রবাহ যুক্ত করা হবে।
সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা: মানবিক ও টেকসই ব্যবসার বাধ্যবাধকতা: প্রস্তাবিত নীতিমালার অনুচ্ছেদ ৮ ও ২০ পর্যালোচনায় দেখা যায়, এতে সাধারণ মানুষ, কারখানার শ্রমিক এবং সরাসরি ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ন্যূনতম শ্রম অধিকার ও মানবিক মর্যাদা লঙ্ঘন করে, তবে তারা শুধু বাহ্যিক অনুদান দিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ দাবি করতে পারবে না।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এ নীতিমালার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এতে শুধু করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থের হিসাব চাওয়া হয়নি, বরং সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও ভোক্তাদের অধিকার রক্ষাকে সার্বিক নীতিমালার মূল স্তম্ভ হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে।







