১০ মাসে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা
- এপ্রিলে ঘাটতি ৬,৫৪৯ কোটি

সংগৃহীত ছবি
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে এ সময়ে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে রাজস্ব আদায়ে।
এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ১০ মাসে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতির ধীরগতি, উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের শ্লথ গতির কারণে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।
তাদের ভাষ্য, অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ভালো থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা কমতে থাকে। গত এপ্রিল মাসে রাজস্ব আদায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। অথচ আগের বছরগুলোতে মাসভিত্তিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ।
জুলাই-এপ্রিল সময়ে কাস্টমস শুল্ক খাতে আদায় হয়েছে ৯০ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
আগের সরকারের সময় বাস্তব সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতির সামগ্রিক মন্থরতাও
একই সময়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩৫ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা কম। গত বছরের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ।
আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ খাতে ঘাটতি ৪৪ হাজার ৩৩ কোটি টাকা, যা তিন খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
এপ্রিলে ঘাটতি ৬,৫৪৯ কোটি টাকা
এপ্রিল মাসে এনবিআর মোট রাজস্ব আদায় করেছে ৩৯ হাজার ৬০ কোটি টাকা। মাসটির সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। ফলে এক মাসেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। তবে গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে রাজস্ব আদায়ে।
এপ্রিলের খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯১০ কোটি টাকা কম। একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।
আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতে আদায় হয়েছে ১১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ৩ হাজার ৪৫ কোটি টাকা হলেও গত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
অন্যদিকে কাস্টমস শুল্ক খাতে আদায় হয়েছে ১০ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ধারাবাহিক রাজস্ব ঘাটতি সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে ভ্যাট খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি অভ্যন্তরীণ ভোগ চাহিদা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অতিরিক্ত লক্ষ্য নির্ধারণের কারণে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। বললেন, আগের সরকারের সময় বাস্তব সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতির সামগ্রিক মন্থরতাও।
‘সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় অংশ আসে এডিপি ব্যয় থেকে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কম থাকায় ভ্যাটসহ বিভিন্ন কর আদায়ে চাপ তৈরি হয়েছে’—যোগ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তার মতে, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় এবং অর্থবছরের শেষ দুই মাসে কিছুটা গতি এলেও বছর শেষে থেকেই যেতে পারে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি।
এনবিআরের কর্মকর্তারাও বলছেন, সরকারি উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ায় উৎসে কর ও ভ্যাট আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে ভ্যাট আদায়ে।




