বিদেশি পর্যটক টানতে পারছে না বাংলাদেশ

সিলেটের সাদা পাথর। ছবি: আইরিন আক্তার মিম
বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পাহাড়, নদী, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— সবই রয়েছে বাংলাদেশে। এই দর্শনীয় স্থানগুলোর সুবাদে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এখনো তৈরি হয়নি কাঙ্ক্ষিত অবস্থান। বরং সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে বিদেশি পর্যটক ও ভ্রমণকারীর সংখ্যা।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনন্য প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণ থাকার পরও পর্যাপ্ত বিনোদন সুবিধার অভাব, সমন্বয়হীনতা, নীতিগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে দুর্বল প্রচারণার কারণে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
এ ছাড়া দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসনের সীমাবদ্ধতা, বিদেশিদের উপযোগী খাবারের বৈচিত্র্যের ঘাটতি এবং প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইডের সংকটও বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বিকাশে বড় বাধা। এর সঙ্গে জটিল ভিসা প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা নিয়ে বিদ্যমান উদ্বেগ নিরুৎসাহিত করছে সম্ভাব্য বিদেশি পর্যটকদের। এই সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা।
এই প্রেক্ষাপটে আজ রবিবার পালন হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হবে দিবসটি। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে এসেছেন ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ বিদেশি ভ্রমণকারী। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৬০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
বিদেশি ভ্রমণকারীর এ পরিসংখ্যানে অবকাশযাপনকারী পর্যটকের পাশাপাশি ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির ভ্রমণকারী অন্তর্ভুক্ত। ফলে প্রকৃত অবকাশযাপনকারী বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আরও কম হতে পারে— মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে আয়ও আশাব্যঞ্জক নয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে ২০২৩ সালে আয় করেছে ৪৫৩ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা কমে ৪৪০ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে জাতিসংঘের সংস্থা ‘ইউএন ট্যুরিজম’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিদেশি পর্যটকদের থেকে বাংলাদেশের আয় আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ১৭ শতাংশ।
কিন্তু এই অগ্রগতি সত্ত্বেও পর্যটনের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ এখনো অনেক পেছনে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ওয়ার্ল্ড ইনকোনমিক ফোরাম) ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স-২০২৬ অনুযায়ী, ১১০টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮তম। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মূল্যায়ন করা ১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সর্বশেষ। বিপরীতে ভারত ৩১তম, শ্রীলঙ্কা ৬৯তম, নেপাল ৮৬তম ও পাকিস্তান ৯৫তম অবস্থান।
বাংলাদেশের প্রথম ন্যাশনাল ট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যানের খসড়ায় ২০৪০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ৫৮ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকার পর্যটনকে অগ্রাধিকার না দিলে অর্জন কঠিন হবে এই লক্ষ্যমাত্রা।
দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের কারণে সবচেয়ে বেশি পর্যটক আকর্ষণ করে কক্সবাজার। তবে বিদেশি পর্যটকদের জন্য সেখানে বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত। কক্সবাজারে প্রাণবন্ত নাইটলাইফ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল নেই। পাশাপাশি প্যারাসেইলিং, স্কুবা ডাইভিং ও স্কাইডাইভিংয়ের মতো বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক বিনোদন সুবিধাও নেই।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের পরিচালক মিজানুর রহমান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। কক্সবাজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্যুরিস্ট স্পট হলেও সেখানে বিচ উপভোগ করা ছাড়া বিদেশি পর্যটকদের সময় কাটানোর আর কোনো উপায় নেই। এ ব্যাপারে সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগও নেই। এ ছাড়া নিরাপত্তা সংকট ও হকার বিড়ম্বনা তো নিয়মিত ব্যাপার।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বললেন, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে অনেক পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছেন তারা।
এর মধ্যে ভিসা পলিসি সহজ করা, কক্সবাজারকে আন্তর্জািতক ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসেবে উন্নত করা, স্পোর্টস ট্যুরিজম, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, রিলিজিয়াস ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো পর্যটন দিবস উপলক্ষে ১৩টি ক্যাটাগরিতে ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ট্যুরিজম বোর্ড।



